সিলেটের ঐতিহ্যবাহী হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.) মাজারের দান-ব্যবস্থাপনা ও সার্বিক তদারকির জন্য গঠিত ১২ সদস্যের কমিটিতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী এবং সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক দুইবারের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীকে অন্তর্ভুক্ত না করায় রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিনের বলয়ভিত্তিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে বিষয়টিকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
সিলেট বিএনপির রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ও আরিফুল হক চৌধুরীর পৃথক বলয়ের অস্তিত্ব রয়েছে। জাতীয় নির্বাচনের আগে দুই নেতার সমর্থকদের মধ্যে প্রকাশ্য মতবিরোধ ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল আলোচনার বিষয়। সিলেট-১ আসনে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন দুজনই। শেষ পর্যন্ত দলের সিদ্ধান্তে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সিলেট-১ আসন থেকে নির্বাচন করেন এবং আরিফুল হক চৌধুরী সিলেট-৪ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে দুজনই মন্ত্রিসভায় স্থান পান।
সরকার গঠনের পর প্রকাশ্যে দ্বন্দ্ব না দেখা গেলেও দুই নেতার মধ্যে নীরব প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা ‘স্নায়ুযুদ্ধ’ রাজনৈতিক মহলে আলোচিত ছিল। এ সময়ে সিলেটের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানে বিএনপির কয়েকজন নেতা দায়িত্ব পান, যাদের অধিকাংশই খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের ঘনিষ্ঠ বলে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে পরিচিত। অন্যদিকে প্রশাসনিক অঙ্গনে আরিফুল হক চৌধুরীর প্রভাবও ছিল উল্লেখযোগ্য। স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সদ্য প্রত্যাহার হওয়া জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমকে আরিফুল হক চৌধুরীর পছন্দের কর্মকর্তা হিসেবে বিবেচনা করা হতো।
মাজারের দান-ব্যবস্থাপনা নিয়ে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগ এবং পরবর্তীতে জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলমের প্রত্যাহারকে ঘিরে রাজনৈতিক সমীকরণে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখছেন অনেকে। বিদেশ সফর শেষে দেশে ফিরে আরিফুল হক চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম ‘আমাদের চোখ খুলে দিয়েছেন’। যদিও তিনি ডিসির প্রত্যাহারকে নিয়মিত প্রশাসনিক বদলি হিসেবেই ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন।
এর দুই দিনের মাথায় সিলেট সফরে এসে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সার্কিট হাউসে এক বৈঠকে মাজার-সংক্রান্ত ১২ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেন। কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব নেন তিনি নিজেই। তবে কমিটিতে রাখা হয়নি মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীকে, যদিও কমিটি ঘোষণার দিন তিনিও সিলেটে অবস্থান করছিলেন।
কমিটির সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, বিভাগীয় কমিশনার, সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার, জেলা পরিষদের প্রশাসক, মাজারের মোতোয়াল্লি পরিবারের প্রতিনিধি, মাদরাসা ও মসজিদের প্রতিনিধি। কমিটির সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন সিলেটের জেলা প্রশাসক।
স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, কমিটির কয়েকজন সদস্য স্থানীয় বিএনপির রাজনীতিতে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। এ কারণে কমিটির গঠন নিয়েও নানা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ চলছে।
এর আগে আরিফুল হক চৌধুরী নিজেই সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, মাজার-সংক্রান্ত বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর আলোচনা হয়েছে এবং সিলেটের সব সংসদ সদস্য, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। কিন্তু চূড়ান্ত কমিটিতে তাঁর নাম না থাকায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।
কমিটিতে আরিফুল হক চৌধুরীকে অন্তর্ভুক্ত না করার কারণ জানতে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের মুঠোফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে প্রতিক্রিয়া জানতে আরিফুল হক চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করেও সাড়া মেলেনি।
এ বিষয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতা সিদ্দিকী অসুস্থতার কথা জানিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। স্থানীয় বিএনপির নেতারাও প্রকাশ্যে মুখ খুলতে অনাগ্রহ দেখিয়েছেন।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। সাংবাদিক মাসুদ আহমদ রনি লিখেছেন, “মাজার কোনো একক সংসদীয় আসনের বিষয় নয়; এটি পুরো সিলেটের ঐতিহ্য। তাই সিলেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জনপ্রতিনিধিকে বাইরে রাখায় প্রতিনিধিত্ব ও অন্তর্ভুক্তি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।”
সিলেট মহানগর বিএনপির এক শীর্ষ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “মাজারের দানের অর্থের স্বচ্ছতা নিশ্চিতের উদ্যোগকে অধিকাংশ মানুষ ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তবে এমন একটি কমিটিতে আরিফুল হক চৌধুরীকে না রাখায় বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সদস্য না করলেও অন্তত পরামর্শক বা আমন্ত্রিত সদস্য হিসেবে যুক্ত করা হলে প্রতিনিধিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠত না।”
উল্লেখ্য, গত ১২ জুন তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার পরিদর্শন করে আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিতের ঘোষণা দেন। এর ধারাবাহিকতায় ১৮ জুন নতুন চারটি দানবাক্স স্থাপন এবং ঐতিহাসিক তিনটি দানের ডেগ ও একটি দানবাক্স সিলগালা করা হয়। পরবর্তীতে ২১ জুন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে তাঁকে প্রত্যাহার করা হয়। পরদিন জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে দানবাক্স ও ডেগ খুলে প্রকাশ্যে অর্থ গণনা করা হয়। জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, চার দিনে আটটি ডেগ ও দানবাক্সে মোট ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা, ৭ আনা স্বর্ণালংকার এবং ১০ সৌদি রিয়াল পাওয়া যায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মাজার ব্যবস্থাপনা কমিটিকে কেন্দ্র করে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তা কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সিলেট বিএনপির অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের ভারসাম্য ও বলয় রাজনীতির নতুন বাস্তবতাও এতে প্রতিফলিত হচ্ছে।
সংবাদ শিরোনাম ::
মাজার কমিটিতে আরিফ নেই, সিলেট বিএনপিতে নতুন করে বলয় রাজনীতির আলোচনা
-
তোফায়েল আহমেদ, সিলেট থেকে - আপডেট সময় ১২:২০:৩৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬
- ১২ বার পড়া হয়েছে
ট্যাগস :
















