পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ঝুঁকি দিন বাড়ছে। একই সাথে পেশা হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির অভাবেও ভুগছেন গণমাধ্যমকর্মীরা। এই প্রেক্ষাপটে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছেন নির্ভীক সংবাদ পত্রিকার খুলনা ব্যুরো প্রধান মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন।
সম্প্রতি খুলনা প্রেসক্লাবে এক আলোচনা সভায় তিনি বলেন, “সাংবাদিকরা রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। দুর্নীতি, অনিয়ম, জনদুর্ভোগের খবর তুলে ধরে তারা সমাজকে সচেতন করেন। অথচ এই সত্য তুলে ধরতে গিয়েই অনেক সাংবাদিক হুমকি, মামলা, হামলার শিকার হচ্ছেন। প্রাণ হারানোর ঘটনাও ঘটছে। রাষ্ট্র যদি সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে, তাহলে গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।”
তিনি আরও বলেন, “সাংবাদিকতা একটি কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ পেশা। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এই পেশার এখনো পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নেই। সরকারি অনেক সুযোগ-সুবিধা থেকে সাংবাদিকরা বঞ্চিত হচ্ছেন। চিকিৎসা, আবাসন, কল্যাণ ট্রাস্টের সুবিধা অনেক ক্ষেত্রেই পৌঁছাচ্ছে না তৃণমূলের সাংবাদিকদের কাছে। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও নীতিমালা প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি।”
ঝুঁকিপূর্ণ পেশা: খুলনার চিত্র
খুলনা অঞ্চলে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাংবাদিকরা নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন। সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় জলদস্যু, বনদস্যু ও চোরাকারবারির খবর করতে গিয়ে প্রাণের ঝুঁকি নিতে হয়। ঘাটের ভাড়া কারসাজি, খাদ্য গুদামের অনিয়ম, সেতুর দুর্নীতির রিপোর্ট করতে গিয়ে স্থানীয় প্রভাবশালীদের রোষানলে পড়তে হয়।
দৈনিক নির্ভীক সংবাদের খুলনা ব্যুরো প্রধান মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, “গত মাসেও বটিয়াঘাটার ঘাটের অনিয়ম নিয়ে রিপোর্ট করার পর আমাকে হুমকি দেওয়া হয়েছে। আমরা প্রতিবাদ করি না, কারণ পাঠকের স্বার্থ বড়। কিন্তু রাষ্ট্র যদি আমাদের নিরাপত্তা না দেয়, তাহলে একদিন সত্য প্রকাশ করাই বন্ধ হয়ে যাবে।”
তিনি জানান, খুলনায় কর্মরত অনেক সাংবাদিক ন্যূনতম বেতন-ভাতাও পান না। প্রেসকার্ড আছে, কিন্তু পরিচয়পত্রের মর্যাদা নেই। থানা, হাসপাতাল, প্রশাসনিক অফিসে হয়রানির শিকার হতে হয়।
রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবি: ৫ দফা প্রস্তাব
মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন সাংবাদিকদের জন্য 5 দফা দাবি তুলে ধরেন:
১. নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন: সাংবাদিক সুরক্ষা আইন দ্রুত প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। সাংবাদিকদের উপর হামলা, মামলা, হুমকির জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রাখতে হবে।
২. রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি: সাংবাদিকতাকে পূর্ণাঙ্গ পেশা হিসেবে গেজেটভুক্ত করে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিতে হবে। প্রেসকার্ডকে জাতীয় পরিচয়পত্রের মতো মর্যাদা দিতে হবে।
৩. কল্যাণ তহবিল: সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের সুবিধা তৃণমূল পর্যায়ের সাংবাদিকদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। দুর্ঘটনা, অসুস্থতা ও মৃত্যুজনিত ক্ষতিপূরণ বাড়াতে হবে।
৪. আবাসন ও চিকিৎসা: বিভাগীয় শহরগুলোতে সাংবাদিকদের জন্য আবাসন প্রকল্প এবং বিশেষায়িত চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
৫. প্রশিক্ষণ ও বেতন কাঠামো: সাংবাদিকদের জন্য ন্যূনতম বেতন কাঠামো নির্ধারণ এবং ডিজিটাল যুগের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
সহকর্মী ও সংগঠনের প্রতিক্রিয়া
তার এই বক্তব্যের সাথে একমত পোষণ করেছেন খুলনার বিভিন্ন গণমাধ্যমের কর্মীরা। খুলনা সাংবাদিক ইউনিয়নের এক নেতা বলেন, “জাহাঙ্গীর ভাই আমাদের মনের কথা বলেছেন। খুলনায় কর্মরত সাংবাদিকরা অবহেলিত। আমরা চাই রাষ্ট্র আমাদের নিরাপত্তা দিক, সম্মান দিক।”
বিশেষজ্ঞ মতামত
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক বলেন, “গণতন্ত্রের জন্য মুক্ত সাংবাদিকতা অপরিহার্য। আর মুক্ত সাংবাদিকতার জন্য নিরাপত্তা পূর্বশর্ত। বাংলাদেশে সাংবাদিক সুরক্ষা আইন নেই বলেই হামলাকারীরা পার পেয়ে যায়। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিলে পেশার মান বাড়বে, দায়বদ্ধতাও বাড়বে।”
সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে জনগণের জানার অধিকার নিশ্চিত করা। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া মানে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা। সরকারের কাছে তার আহ্বান অবিলম্বে সাংবাদিক সুরক্ষা আইন প্রণয়ন ও সাংবাদিক কল্যাণে কার্যকর পদক্ষেপ নিন।
খুলনাসহ সারাদেশের সাংবাদিকরা যেন নির্ভয়ে, নিরাপদে সত্যের পক্ষে কলম ধরতে পারেন – এটাই হোক আমাদের সবার অঙ্গীকার।
খুলনা অফিস 
























