ঢাকা ০৬:৩২ অপরাহ্ন, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬, ৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে কটুক্তি-ব্যঙ্গচিত্র,২৭ মামলার আসামি কামাল প্রধান এখনো প্রকাশ্যে খুলনা ডিবি পুলিশের হাতে বি কোম্পানির সক্রিয় ৫ সন্ত্রাসী গ্রেফতার পাবনার ভাঙ্গুড়ায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের ৩৫ টি ঘর বিক্রি, পরিত্যক্ত ঘরে জুয়া-মাদক ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ক্ষমতার পালাবদলে নাম বদলে গেছে সিলেট চন্ডীপুল গোলচত্বর সহ অন্যান্য স্থাপনার বিয়ের সাজ না খুলতেই মৃত্যুর ডাক: নববধূকে রেখে চিরবিদায়ে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা জুয়েল রানা খুলনায় আন্তর্জাতিকমানের আধুনিক খাদ্য সংরক্ষণাগার (গমের স্টিল সাইলো) নির্মাণ সম্পন্ন খুলনার বটিয়াঘাটার খেয়া ঘাটে দ্বিগুণ ভাড়া আদায়: কর্তৃপক্ষ নিরব মাদকের খুচরা বিক্রেতা নয়, ডিলার ও গডফাদারদের গ্রেফতারের পরামর্শ সাংবাদিকদের কেএমপির অতিরিক্ত কমিশনার রাশিদুল ইসলাম খানকে স্ট্যান্ড রিলিজ  খুলনার ডাক্তারপাড়া হেফজখানায় শিশু শিক্ষার্থীকে অমানবিক নির্যাতন

খুলনার বটিয়াঘাটার খেয়া ঘাটে দ্বিগুণ ভাড়া আদায়: কর্তৃপক্ষ নিরব

বর্ষার শুরুতেই খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার নদীপারের মানুষের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। সরকার নির্ধারিত ভাড়ার তোয়াক্কা না করে উপজেলার প্রায় সকল খেয়া ঘাটে যাত্রী ও যানবাহন থেকে দ্বিগুণ থেকে চারগুণ পর্যন্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে ইজারাদার ও তাদের লোকজনের বিরুদ্ধে। রেট চার্ট নেই, তদারকি নেই, প্রতিকার নেই – এমন নৈরাজ্যকর পরিস্থিতিতে প্রতিদিন হাজারো মানুষকে অতিরিক্ত টাকা গুনে জীবিকার তাগিদে নদী পার হতে হচ্ছে।

নির্ভীক সংবাদ এ প্রতিনিধি রবিবার সরেজমিনে বটিয়াঘাটা-বিরাট, বটিয়াঘাটা-ফুলতলা, কতিয়ানগলা
– শিয়ালিডাঙ্গা, গোপালখালী-হালিয়া, বারআড়িয়া-নারায়নপুর ও শোলমারী ঘাট পরিদর্শন করে দেখেন, প্রতিটি ঘাটের চিত্র এক ও অভিন্ন। ইজারাদারের লোকজন নৌকার ঘাটে দাঁড়িয়ে যাত্রীর কাছ থেকে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বাড়তি টাকা দাবি করছেন। প্রতিবাদ করলেই হুমকি-ধমকি, “পার হতে না চাইলে যান, নৌকা আটকে থাকবে না”।

*সরকারি রেট বনাম বাস্তবতা: চারগুণ বেশি আদায়*

উপজেলা প্রশাসনের নির্ধারিত রেট চার্ট অনুযায়ী, বটিয়াঘাটা-বিরাট ঘাটে নৌকায় সাধারণ যাত্রী পারাপারের ভাড়া মাত্র 5 টাকা। কিন্তু বাস্তবে যাত্রীর কাছ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে। অর্থাৎ সরকারি রেটের চারগুণ। মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে নির্ধারিত ভাড়া ৫০ টাকা থাকলেও স্থানীয়রা জানান, বাস্তবে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত দাবি করা হয়। গরু পারাপারে ৫০ টাকা, ছাগল ১০টাকা নির্ধারিত থাকলেও আদায় করা হয় দ্বিগুণ। মালামাল প্রতি মন ভেদেও নির্ধারিত রেটের কোনো বালাই নেই।

 

বিনাইখালী গ্রামের দিনমজুর আজমল হোসেন দৈনিক স্বাধীন মতকে বলেন, “সাইকেল নিয়ে প্রতিদিন খুলনা শহরে কাজে যাই। সাইকেলের সরকারি ভাড়া ১০ টাকা। কিন্তু ঘাটের লোকজন ৪০-৫০ টাকা ছাড়া পার করতেই চায় না। ৪০০ টাকা দৈনিক আয়ের কামলা আমি। যাওয়া-আসায় ঘাটেই ৮০-১০০ টাকা চলে যায়। সংসার চালাবো কেমনে? পেটে ভাত দিবো না ঘাটের লোকের পকেট ভরবো?”

কৃষক রহিমা বেগম অভিযোগের সুরে বলেন, “বুড়া মানুষ, বাজারের থলে নিয়ে ফুলতলা যাই। শুনেছি নৌকা ভাড়া ৫ টাকা। কিন্তু ঘাটে গেলে ২০ টাকা না দিলে নৌকা ছাড়ে না। ঝগড়া করার শক্তি নাই, চুপচাপ দিয়ে দেই। গরিবের কান্না শোনার কেউ নাই।”

*ইজারাদারের যুক্তি ও নৌচালকের বাধ্যবাধকতা*

এ বিষয়ে কথা বললে একাধিক ইজারাদার একই সুরে বলেন, “ডাকে বেশি টাকা দিয়ে আমরা ঘাট ইজারা নিয়েছি। সরকারি রেটে ভাড়া নিলে ইজার টাকাই উঠবে না। উপরে ম্যানেজ দিতে হয়, কর্মচারীর বেতন দিতে হয়। তাই বাধ্য হয়ে যাত্রীর কাছ থেকে বাড়তি টাকা নিতে হচ্ছে।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নৌচালক নামের শর্তে দৈনিক স্বাধীন মতকে বলেন, “আমরা দিনশেষে ইজারাদারকে নির্দিষ্ট টাকা জমা দেই। সেই টাকা না দিতে পারলে পরের দিন আর নৌকা চালাতে দেবে না। ইজারাদার বলে দিয়েছে, যাত্রীর কাছ থেকে যেভাবে পারো টাকা উঠাও। রেট চার্ট টাঙালে তো আমাদেরই বিপদ। যাত্রী সরকারি রেটের কথা বললে মারমুখী হয়ে ওঠে ইজারাদারের লোক।”

তবে যাত্রীদের পাল্টা প্রশ্ন, ডাকে বেশি টাকা দিয়ে ঘাট ইজারা নেওয়া ইজারাদারের ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত। সেই ঝুঁকি কেন সাধারণ যাত্রীর কাঁধে চাপানো হবে? সরকার যখন রেট নির্ধারণ করে দিয়েছে, তখন সেই রেট বাস্তবায়নের দায়িত্ব কার?

*অবৈধ ‘জলদি নৌকা’: নতুন প্রতারণার ফাঁদ*

সরেজমিনে আরও দেখা যায়, কিছু ঘাটে ‘জলদি নৌকা’ নামে নতুন এক প্রতারণার ফাঁদ পাতা হয়েছে। এই নৌকাগুলোর সরকারি কোনো অনুমতি নেই বলে স্থানীয়রা নিশ্চিত করেছেন। কিন্তু অতিরিক্ত ৩০ থেকে ৫০ টাকার বিনিময়ে এই নৌকা দ্রুত পার করে দিচ্ছে যাত্রীদের। সাধারণ নৌকার জন্য ৩০-৪০ মিনিট অপেক্ষা করতে হলেও জলদি নৌকার জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। ফলে অফিসগামী, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও রোগী নিয়ে যাওয়া অ্যাম্বুলেন্সও বাধ্য হয়ে এই অবৈধ নৌকায় চড়ছে।

শিয়ালিডাঙ্গা ঘাটের শিক্ষক আব্দুল মজিদ বলেন, “সকাল 8টায় স্কুলে ক্লাস। সাধারণ নৌকায় গেলে দেরি হয়ে যাবে। বাধ্য হয়ে ৫ টাকার জায়গায় ৫০ টাকা দিয়ে জলদি নৌকায় উঠি। এটা তো একরকম জিম্মি করা। প্রশাসন সব জানে, কিন্তু দেখেও না দেখার ভান করে।”

*প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি: কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ?*

এ বিষয়ে বটিয়াঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খান্দকার কামরুজ্জামান দৈনিক স্বাধীন মতকে বলেন, “ইতোমধ্যে বিভিন্ন ঘাটের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের লিখিত ও মৌখিক অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি আমি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিয়েছি। আগামী 48 ঘণ্টার মধ্যে প্রতিটি ঘাটে বড় করে সরকার অনুমোদিত রেট চার্ট টাঙানো এবং মাইকিংয়ের মাধ্যমে যাত্রীদের সচেতন করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যারা নির্ধারিত ভাড়ার বেশি আদায় করবে তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে জরিমানা ও ইজারা বাতিলের সুপারিশ করা হবে।”

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমের শুরুতে প্রশাসন একই কথা বলে। রেট চার্ট টাঙানো হয় 2-3 দিনের জন্য, তারপর আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। মোবাইল কোর্টও হয় লোক দেখানো, বছরে 1-2 বার।

উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি বলেন, “ঘাট ইজারা দেওয়ার সময় দরপত্রের শর্তেই উল্লেখ থাকে সরকারি রেট মানতে হবে। কেউ শর্ত ভঙ্গ করলে ইজারা বাতিলের সুপারিশ করা হবে। কিন্তু প্রমাণ ছাড়া ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন। যাত্রীদের উচিত ওভারচার্জের ভিডিও বা অডিও রেকর্ড করে রাখা এবং উপজেলা অফিসে অভিযোগ দেওয়া।”

*অর্থনৈতিক লুটপাট: বছরে ১০ কোটি টাকা গায়েব*

বটিয়াঘাটা উপজেলায় প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২০ হাজার মানুষ নদী পারাপার করেন। গড়ে যদি প্রতিজন মাত্র ১৫ টাকা করেও বেশি দেন, তাহলে দিনে ২ লাখ ২৫ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকা অতিরিক্ত আদায় হচ্ছে। মাসে এই অংক দাঁড়ায় ৬৭ লাখ থেকে ৯০ লাখ টাকা। বছরে প্রায় ৮ থেকে ১০কোটি টাকা যাত্রীদের পকেট থেকে অতিরিক্ত যাচ্ছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের হাতে।

এই টাকা যদি সরকারি কোষাগারে জমা হতো, তাহলে তা দিয়ে ঘাটের অবকাঠামো উন্নয়ন, যাত্রী ছাউনি নির্মাণ, রাতে চলাচলের জন্য লাইটিং, লাইফ জ্যাকেট কেনা সম্ভব হতো। কিন্তু বাস্তবে টাকাটা যাচ্ছে একটি চক্রের পকেটে, সরকার পাচ্ছে না রাজস্ব, যাত্রী পাচ্ছে না সেবা।

*নিরাপত্তা ঝুঁকি: ভাড়ার সাথে জীবনের জুয়া*

অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের পাশাপাশি নৌকার নিরাপত্তা নিয়েও চরম অবহেলা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অধিকাংশ নৌকায় লাইফ জ্যাকেট নেই, ধারণক্ষমতার চেয়ে দ্বিগুণ যাত্রী ও মালামাল তোলা হয়। বর্ষায় নদী উত্তাল থাকলেও ওভারলোড নৌকা ছাড়তে বাধ্য করা হয়। গত সপ্তাহে গোপালখালী ঘাটে একটি নৌকা ডুবতে ডুবতে রক্ষা পায়।

গোপালখালীর গৃহবধূ সালমা খাতুন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “৬০ জন মানুষের নৌকায় ১০০ জন তুলে দিছে। আমি বললাম, মা, জায়গা নাই। উত্তর দিল, টাকা দিলে জায়গা হয়। ৫ টাকার ভাড়া ২০ টাকা দিয়েও জীবনের নিরাপত্তা নাই। জীবনের দাম নাই ওদের কাছে, টাকাই সব।”

*বিশেষজ্ঞ মতামত ও যাত্রীর ৫ দফা দাবি*

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মাহফুজুর রহমান দৈনিক স্বাধীন মতকে বলেন, “ঘাট ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আনতে হলে তিনটি সংস্কার জরুরি। প্রথমত, প্রতিটি ঘাটে বড় আকারে, আবহাওয়া সহনশীল রেট চার্ট টাঙানো এবং সপ্তাহে অন্তত একবার ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তদারকি। দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল টিকিট সিস্টেম চালু করা যাতে প্রতিটি টাকার হিসাব থাকে এবং রাজস্ব ফাঁকি বন্ধ হয়। তৃতীয়ত, প্রতিটি ঘাটে যাত্রী কল্যাণ কমিটি গঠন করে তাদের দিয়ে মনিটরিং করানো।”

স্থানীয় যাত্রীদের পক্ষ থেকে ৫ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়েছে:
১. প্রতিটি ঘাটে সরকার অনুমোদিত রেট চার্ট বড় অক্ষরে, টেকসই বোর্ডে টাঙানো
২. সপ্তাহে অন্তত একদিন মোবাইল কোর্ট পরিচালনা ওভারচার্জকারীদের জরিমানা
৩. ‘জলদি নৌকা’ নামের অবৈধ ও অনুমতিহীন সার্ভিস অবিলম্বে বন্ধ
৪. নৌকার ধারণক্ষমতা ও লাইফ জ্যাকেটসহ নিরাপত্তা সামগ্রী নিশ্চিত করা
৫. অভিযোগ জানানোর জন্য উপজেলা প্রশাসনের হটলাইন নম্বর চালু ও দ্রুত প্রতিকার

*প্রতিবেদকের বক্তব্য *

এই প্রতিবেদক মত মনে করে, নদীপারের মানুষের দুর্ভোগ লাঘব করা সরকার ও প্রশাসনের নৈতিক দায়িত্ব। ইজারাদারের লাভ-লোকসানের অজুহাতে সাধারণ মানুষের পকেট কাটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা যেহেতু ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তাই আগামী ৭ দিন পর নির্ভীক সংবাদের এ প্রতিনিধি দল আবার সরেজমিন যাবে। দেখা হবে, প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়েছে কিনা, রেট চার্ট টাঙানো হয়েছে কিনা, যাত্রীর পকেট থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায় বন্ধ হয়েছে কিনা।

প্রতিশ্রুতি রক্ষা না হলে পরের সংখ্যায় প্রকাশ হবে “UNO এর প্রতিশ্রুতি: ৭ দিনেও রেট চার্ট টাঙলো না বটিয়াঘাটার ঘাটে” শীর্ষক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রশাসনের সদিচ্ছা আর জনগণের সচেতনতা – এই দুইয়ের মেলবন্ধনই পারে বটিয়াঘাটার ঘাটগুলোকে যাত্রীবান্ধব ও দুর্নীতিমুক্ত করতে।

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে কটুক্তি-ব্যঙ্গচিত্র,২৭ মামলার আসামি কামাল প্রধান এখনো প্রকাশ্যে

খুলনার বটিয়াঘাটার খেয়া ঘাটে দ্বিগুণ ভাড়া আদায়: কর্তৃপক্ষ নিরব

আপডেট সময় ১২:৩৪:২০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

বর্ষার শুরুতেই খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার নদীপারের মানুষের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। সরকার নির্ধারিত ভাড়ার তোয়াক্কা না করে উপজেলার প্রায় সকল খেয়া ঘাটে যাত্রী ও যানবাহন থেকে দ্বিগুণ থেকে চারগুণ পর্যন্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে ইজারাদার ও তাদের লোকজনের বিরুদ্ধে। রেট চার্ট নেই, তদারকি নেই, প্রতিকার নেই – এমন নৈরাজ্যকর পরিস্থিতিতে প্রতিদিন হাজারো মানুষকে অতিরিক্ত টাকা গুনে জীবিকার তাগিদে নদী পার হতে হচ্ছে।

নির্ভীক সংবাদ এ প্রতিনিধি রবিবার সরেজমিনে বটিয়াঘাটা-বিরাট, বটিয়াঘাটা-ফুলতলা, কতিয়ানগলা
– শিয়ালিডাঙ্গা, গোপালখালী-হালিয়া, বারআড়িয়া-নারায়নপুর ও শোলমারী ঘাট পরিদর্শন করে দেখেন, প্রতিটি ঘাটের চিত্র এক ও অভিন্ন। ইজারাদারের লোকজন নৌকার ঘাটে দাঁড়িয়ে যাত্রীর কাছ থেকে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বাড়তি টাকা দাবি করছেন। প্রতিবাদ করলেই হুমকি-ধমকি, “পার হতে না চাইলে যান, নৌকা আটকে থাকবে না”।

*সরকারি রেট বনাম বাস্তবতা: চারগুণ বেশি আদায়*

উপজেলা প্রশাসনের নির্ধারিত রেট চার্ট অনুযায়ী, বটিয়াঘাটা-বিরাট ঘাটে নৌকায় সাধারণ যাত্রী পারাপারের ভাড়া মাত্র 5 টাকা। কিন্তু বাস্তবে যাত্রীর কাছ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে। অর্থাৎ সরকারি রেটের চারগুণ। মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে নির্ধারিত ভাড়া ৫০ টাকা থাকলেও স্থানীয়রা জানান, বাস্তবে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত দাবি করা হয়। গরু পারাপারে ৫০ টাকা, ছাগল ১০টাকা নির্ধারিত থাকলেও আদায় করা হয় দ্বিগুণ। মালামাল প্রতি মন ভেদেও নির্ধারিত রেটের কোনো বালাই নেই।

 

বিনাইখালী গ্রামের দিনমজুর আজমল হোসেন দৈনিক স্বাধীন মতকে বলেন, “সাইকেল নিয়ে প্রতিদিন খুলনা শহরে কাজে যাই। সাইকেলের সরকারি ভাড়া ১০ টাকা। কিন্তু ঘাটের লোকজন ৪০-৫০ টাকা ছাড়া পার করতেই চায় না। ৪০০ টাকা দৈনিক আয়ের কামলা আমি। যাওয়া-আসায় ঘাটেই ৮০-১০০ টাকা চলে যায়। সংসার চালাবো কেমনে? পেটে ভাত দিবো না ঘাটের লোকের পকেট ভরবো?”

কৃষক রহিমা বেগম অভিযোগের সুরে বলেন, “বুড়া মানুষ, বাজারের থলে নিয়ে ফুলতলা যাই। শুনেছি নৌকা ভাড়া ৫ টাকা। কিন্তু ঘাটে গেলে ২০ টাকা না দিলে নৌকা ছাড়ে না। ঝগড়া করার শক্তি নাই, চুপচাপ দিয়ে দেই। গরিবের কান্না শোনার কেউ নাই।”

*ইজারাদারের যুক্তি ও নৌচালকের বাধ্যবাধকতা*

এ বিষয়ে কথা বললে একাধিক ইজারাদার একই সুরে বলেন, “ডাকে বেশি টাকা দিয়ে আমরা ঘাট ইজারা নিয়েছি। সরকারি রেটে ভাড়া নিলে ইজার টাকাই উঠবে না। উপরে ম্যানেজ দিতে হয়, কর্মচারীর বেতন দিতে হয়। তাই বাধ্য হয়ে যাত্রীর কাছ থেকে বাড়তি টাকা নিতে হচ্ছে।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নৌচালক নামের শর্তে দৈনিক স্বাধীন মতকে বলেন, “আমরা দিনশেষে ইজারাদারকে নির্দিষ্ট টাকা জমা দেই। সেই টাকা না দিতে পারলে পরের দিন আর নৌকা চালাতে দেবে না। ইজারাদার বলে দিয়েছে, যাত্রীর কাছ থেকে যেভাবে পারো টাকা উঠাও। রেট চার্ট টাঙালে তো আমাদেরই বিপদ। যাত্রী সরকারি রেটের কথা বললে মারমুখী হয়ে ওঠে ইজারাদারের লোক।”

তবে যাত্রীদের পাল্টা প্রশ্ন, ডাকে বেশি টাকা দিয়ে ঘাট ইজারা নেওয়া ইজারাদারের ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত। সেই ঝুঁকি কেন সাধারণ যাত্রীর কাঁধে চাপানো হবে? সরকার যখন রেট নির্ধারণ করে দিয়েছে, তখন সেই রেট বাস্তবায়নের দায়িত্ব কার?

*অবৈধ ‘জলদি নৌকা’: নতুন প্রতারণার ফাঁদ*

সরেজমিনে আরও দেখা যায়, কিছু ঘাটে ‘জলদি নৌকা’ নামে নতুন এক প্রতারণার ফাঁদ পাতা হয়েছে। এই নৌকাগুলোর সরকারি কোনো অনুমতি নেই বলে স্থানীয়রা নিশ্চিত করেছেন। কিন্তু অতিরিক্ত ৩০ থেকে ৫০ টাকার বিনিময়ে এই নৌকা দ্রুত পার করে দিচ্ছে যাত্রীদের। সাধারণ নৌকার জন্য ৩০-৪০ মিনিট অপেক্ষা করতে হলেও জলদি নৌকার জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। ফলে অফিসগামী, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও রোগী নিয়ে যাওয়া অ্যাম্বুলেন্সও বাধ্য হয়ে এই অবৈধ নৌকায় চড়ছে।

শিয়ালিডাঙ্গা ঘাটের শিক্ষক আব্দুল মজিদ বলেন, “সকাল 8টায় স্কুলে ক্লাস। সাধারণ নৌকায় গেলে দেরি হয়ে যাবে। বাধ্য হয়ে ৫ টাকার জায়গায় ৫০ টাকা দিয়ে জলদি নৌকায় উঠি। এটা তো একরকম জিম্মি করা। প্রশাসন সব জানে, কিন্তু দেখেও না দেখার ভান করে।”

*প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি: কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ?*

এ বিষয়ে বটিয়াঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খান্দকার কামরুজ্জামান দৈনিক স্বাধীন মতকে বলেন, “ইতোমধ্যে বিভিন্ন ঘাটের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের লিখিত ও মৌখিক অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি আমি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিয়েছি। আগামী 48 ঘণ্টার মধ্যে প্রতিটি ঘাটে বড় করে সরকার অনুমোদিত রেট চার্ট টাঙানো এবং মাইকিংয়ের মাধ্যমে যাত্রীদের সচেতন করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যারা নির্ধারিত ভাড়ার বেশি আদায় করবে তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে জরিমানা ও ইজারা বাতিলের সুপারিশ করা হবে।”

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমের শুরুতে প্রশাসন একই কথা বলে। রেট চার্ট টাঙানো হয় 2-3 দিনের জন্য, তারপর আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। মোবাইল কোর্টও হয় লোক দেখানো, বছরে 1-2 বার।

উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি বলেন, “ঘাট ইজারা দেওয়ার সময় দরপত্রের শর্তেই উল্লেখ থাকে সরকারি রেট মানতে হবে। কেউ শর্ত ভঙ্গ করলে ইজারা বাতিলের সুপারিশ করা হবে। কিন্তু প্রমাণ ছাড়া ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন। যাত্রীদের উচিত ওভারচার্জের ভিডিও বা অডিও রেকর্ড করে রাখা এবং উপজেলা অফিসে অভিযোগ দেওয়া।”

*অর্থনৈতিক লুটপাট: বছরে ১০ কোটি টাকা গায়েব*

বটিয়াঘাটা উপজেলায় প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২০ হাজার মানুষ নদী পারাপার করেন। গড়ে যদি প্রতিজন মাত্র ১৫ টাকা করেও বেশি দেন, তাহলে দিনে ২ লাখ ২৫ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকা অতিরিক্ত আদায় হচ্ছে। মাসে এই অংক দাঁড়ায় ৬৭ লাখ থেকে ৯০ লাখ টাকা। বছরে প্রায় ৮ থেকে ১০কোটি টাকা যাত্রীদের পকেট থেকে অতিরিক্ত যাচ্ছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের হাতে।

এই টাকা যদি সরকারি কোষাগারে জমা হতো, তাহলে তা দিয়ে ঘাটের অবকাঠামো উন্নয়ন, যাত্রী ছাউনি নির্মাণ, রাতে চলাচলের জন্য লাইটিং, লাইফ জ্যাকেট কেনা সম্ভব হতো। কিন্তু বাস্তবে টাকাটা যাচ্ছে একটি চক্রের পকেটে, সরকার পাচ্ছে না রাজস্ব, যাত্রী পাচ্ছে না সেবা।

*নিরাপত্তা ঝুঁকি: ভাড়ার সাথে জীবনের জুয়া*

অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের পাশাপাশি নৌকার নিরাপত্তা নিয়েও চরম অবহেলা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অধিকাংশ নৌকায় লাইফ জ্যাকেট নেই, ধারণক্ষমতার চেয়ে দ্বিগুণ যাত্রী ও মালামাল তোলা হয়। বর্ষায় নদী উত্তাল থাকলেও ওভারলোড নৌকা ছাড়তে বাধ্য করা হয়। গত সপ্তাহে গোপালখালী ঘাটে একটি নৌকা ডুবতে ডুবতে রক্ষা পায়।

গোপালখালীর গৃহবধূ সালমা খাতুন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “৬০ জন মানুষের নৌকায় ১০০ জন তুলে দিছে। আমি বললাম, মা, জায়গা নাই। উত্তর দিল, টাকা দিলে জায়গা হয়। ৫ টাকার ভাড়া ২০ টাকা দিয়েও জীবনের নিরাপত্তা নাই। জীবনের দাম নাই ওদের কাছে, টাকাই সব।”

*বিশেষজ্ঞ মতামত ও যাত্রীর ৫ দফা দাবি*

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মাহফুজুর রহমান দৈনিক স্বাধীন মতকে বলেন, “ঘাট ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আনতে হলে তিনটি সংস্কার জরুরি। প্রথমত, প্রতিটি ঘাটে বড় আকারে, আবহাওয়া সহনশীল রেট চার্ট টাঙানো এবং সপ্তাহে অন্তত একবার ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তদারকি। দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল টিকিট সিস্টেম চালু করা যাতে প্রতিটি টাকার হিসাব থাকে এবং রাজস্ব ফাঁকি বন্ধ হয়। তৃতীয়ত, প্রতিটি ঘাটে যাত্রী কল্যাণ কমিটি গঠন করে তাদের দিয়ে মনিটরিং করানো।”

স্থানীয় যাত্রীদের পক্ষ থেকে ৫ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়েছে:
১. প্রতিটি ঘাটে সরকার অনুমোদিত রেট চার্ট বড় অক্ষরে, টেকসই বোর্ডে টাঙানো
২. সপ্তাহে অন্তত একদিন মোবাইল কোর্ট পরিচালনা ওভারচার্জকারীদের জরিমানা
৩. ‘জলদি নৌকা’ নামের অবৈধ ও অনুমতিহীন সার্ভিস অবিলম্বে বন্ধ
৪. নৌকার ধারণক্ষমতা ও লাইফ জ্যাকেটসহ নিরাপত্তা সামগ্রী নিশ্চিত করা
৫. অভিযোগ জানানোর জন্য উপজেলা প্রশাসনের হটলাইন নম্বর চালু ও দ্রুত প্রতিকার

*প্রতিবেদকের বক্তব্য *

এই প্রতিবেদক মত মনে করে, নদীপারের মানুষের দুর্ভোগ লাঘব করা সরকার ও প্রশাসনের নৈতিক দায়িত্ব। ইজারাদারের লাভ-লোকসানের অজুহাতে সাধারণ মানুষের পকেট কাটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা যেহেতু ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তাই আগামী ৭ দিন পর নির্ভীক সংবাদের এ প্রতিনিধি দল আবার সরেজমিন যাবে। দেখা হবে, প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়েছে কিনা, রেট চার্ট টাঙানো হয়েছে কিনা, যাত্রীর পকেট থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায় বন্ধ হয়েছে কিনা।

প্রতিশ্রুতি রক্ষা না হলে পরের সংখ্যায় প্রকাশ হবে “UNO এর প্রতিশ্রুতি: ৭ দিনেও রেট চার্ট টাঙলো না বটিয়াঘাটার ঘাটে” শীর্ষক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রশাসনের সদিচ্ছা আর জনগণের সচেতনতা – এই দুইয়ের মেলবন্ধনই পারে বটিয়াঘাটার ঘাটগুলোকে যাত্রীবান্ধব ও দুর্নীতিমুক্ত করতে।