কিছু মানুষ জীবনে আসে নক্ষত্রের মতো—অল্প সময়ের জন্য, অথচ তাদের আলো বহুদিন থেকে যায়। তারা চলে যায় নিমেষেই, কিন্তু রেখে যায় এমন এক শূন্যতা, যার কোনো পূর্ণচ্ছেদ নেই।
আবু সুফিয়ান তেমনই এক নক্ষত্র
মানুষের ভিড়ে সবাই মানুষ হয়ে উঠতে পারে না; কেউ কেউ হয়ে ওঠে স্মৃতি, কেউ হয়ে ওঠে গল্প, আর কেউ হয়ে ওঠে হৃদয়ের গভীরে গেঁথে থাকা এক অমোচনীয় নাম। আবু সুফিয়ান ছিলেন তেমন একজন—যাঁর উপস্থিতি হয়তো ছিল ক্ষণিকের, কিন্তু তাঁর অনুপস্থিতি দীর্ঘ এক সময়ের মতো ভারী।
জীবন বড় নিষ্ঠুর। কখনো কখনো কোনো বিদায়ের জন্য প্রস্তুত হওয়ার সুযোগই দেয় না। এক মুহূর্ত আগে যে মানুষটি কথা বলছিল, হাসছিল, স্বপ্ন দেখছিল—পরের মুহূর্তেই সে হয়ে যায় কেবল স্মৃতি। তখন বুঝি, মানুষ আসলে কতটা ক্ষণস্থায়ী; অথচ তার রেখে যাওয়া ভালোবাসা কতটা –
আবু সুফিয়ানও চলে গেলো সেই অমোঘ নিয়মেরই কাছে।
নক্ষত্রটি নিভে গেল—কিন্তু আকাশ কি সত্যিই অন্ধকার হয়ে গেল?
ছাত্রজীবন থেকেই আবু সুফিয়ান যুক্ত ছিলেন প্রগতিশীল রাজনৈতিক চিন্তাধারার সঙ্গে। ন্যায়সঙ্গত যেকোনো দাবি, অধিকার ও মানুষের মুক্তির প্রশ্নেও ছিলো রাজপথের সামনের সারির কর্মী। প্রচণ্ড আবেগী, রাগী—কখনো কখনো বিস্ফোরণের মতো; আবার সেই মানুষই ছিলো ভীষণ কোমল ও আবেগপ্রবণ। মানুষের কষ্ট তাঁকে নাড়া দিত, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর তাগিদ তাঁকে ঘর থেকে রাজপথে নিয়ে যেত।
কিন্তু তাঁর এই আবেগই হয়ে উঠেছিল তাঁর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।
কিছু লুটেরা-জোচ্চোর-ভণ্ড-বেশ্যার দালাল-সুদখোর-ফাঁপরবাজ-ফড়িয়া বারবার তাঁর আবেগকে বাজারে তুলেছে। তাঁর সরলতা, বিশ্বাস আর মানুষের জন্য কিছু করার অদম্য আকাঙ্ক্ষাকে পুঁজি করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করেছে। সুফিয়ান বারবার প্রতারিত হয়েছেন, কিন্তু মানুষের জন্য আলো জ্বালানোর কাজ থামাইনি।
নিজের ঘরের অন্ধকার বাড়িয়ে ও অন্যের ঘরে আলো জ্বালিয়েছে।
দিনের পর দিন বউয়ের নাকের নোলক বিক্রি করে, ছেলের খাতা-কলম কেনার টাকা, মেয়ের দুধ কেনার পয়সা দিয়ে—জ্ঞানের বাতি দান করেছেন অকাতরে।
যে মানুষ নিজের সংসারের অভাব ভুলে অন্যের সন্তানকে বই তুলে দিতে পারে, তাকে হয়তো অর্থের হিসাব দিয়ে বোঝা যায় না। তার হিসাব থাকে অন্য কোথাও— কিছু মানুষের স্মৃতিতে, বিবেকে, আর পরম করুণাময়ের দরবারে।
দর্শনা নামের এই গ্রামীণ শহরে গণ উন্নয়ন গ্রন্থাগার ছিল তাঁর কাছে শুধু একটি পাঠাগার নয়; ছিল জ্ঞান বিতরণের এক স্বপ্ন, এই বন্ধ্যা শহরের এক ‘দারুল-হিকমা’।
তাঁর স্বপ্ন ছিল—মানুষকে ভিক্ষা নয়, জ্ঞান দেওয়া; ক্ষণিকের সহায়তা নয়, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর শক্তি দেওয়া।
তাঁর সেই আহ্বান—
“একমুঠো ভাত নয়, একমুঠো আলো দাও।”
এই বাক্যের মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে আবু সুফিয়ানের পুরো জীবনদর্শন।
অথচ কী নির্মম পরিহাস!
যে মানুষটা নিজের চিকিৎসার জন্য বউয়ের দেওয়া টাকা, ছেলের টিউশনের আয়ের টাকা, মেয়ের স্কুলের উপবৃত্তির টাকা পর্যন্ত জ্ঞানচর্চার এই প্রতিষ্ঠানটির পেছনে ব্যয় করেছেন—তাঁর প্রিয় পাঠকগণ, বিদ্বগ্ধ সমাজপতিগণ তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলোতে খবর রাখেনি।
কেউ কি একবারও জানতে চেয়েছে—
“আজ সুফিয়ান খেয়েছে কি না ?”
যে মানুষটা অন্যের জন্য সারাজীবন আলো জ্বালালেন, তাঁর নিজের ঘরে তখনও অন্ধকার ছিল।
আর অন্যদিকে সাদা পোশাকধারী তথাকথিত দেশপ্রেমী উন্নয়নজীবকেরা উন্নয়ন বিক্রি করে নিজেদের পাঁচ ‘ম’-এর নেশায় বুঁদ হয়ে রইলেন। মানুষের জন্য উন্নয়ন, সমাজের জন্য উন্নয়ন, জ্ঞানের জন্য উন্নয়ন—সবকিছুর বড় বড় কথা হলো; কিন্তু যে মানুষটি নিঃস্ব হয়ে সত্যিকারের জ্ঞানচর্চার ভিত গড়ে গেলেন, তাঁর জীবনের খবর নেওয়ার সময়ই হলো না!
এটাই বোধহয় আমাদের সমাজের; রাষ্ট্রের সবচেয়ে নির্মম ব্যঙ্গ।
যে মানুষটা এ শহরে জ্ঞানের বাতি জ্বালাতে নিজের ঘরের প্রদীপ নিভিয়েছেন, তাঁর মৃত্যুর পর আমরা কয়েকটি ফুল, কিছু দোয়া, কয়েকটি বক্তৃতা আর একটি শোকসভা দিয়ে দায়িত্ব শেষ করে ফেলি।
মাত্র তো কয়েকদিন হলো সুফিয়ান চলে গেলো।
শোকসভা হলো।
দোয়া-দরুদ হলো।
কয়েকটি আবেগঘন কথা হলো।
শেষ!
তারপর জীবন আবার আগের মতো।
সুফিয়ানও ধীরে ধীরে মানুষের স্মৃতি থেকে সরে যাবে। হয়তো কোনো একদিন তাঁর মৃত্যুদিবসে যদি আমার মনে থাকে কিংবা ফেসবুকের ‘Memories’ হঠাৎ পুরোনো কোনো ছবি সামনে আসে তখন বলবো—
“আজ আবু সুফিয়ানের চলে যাওয়ার দিন।”
তখন যদি মনে থাকে হয়তো আবার লিখব।
আজ আর কী লিখব?
থাক।
সুফিয়ান যেখানে গেছে, সেখানেই নিশ্চয়ই ভালো আছে। এই দুনিয়ার হিসাবের খাতা বড়ই অদ্ভুত; কিন্তু পরম করুণাময়ের হিসাব নিখুঁত। তিনি নিশ্চয়ই সুফিয়ানকে তাঁর মতো করেই হেফাজতে রাখবেন।
আমাদের আর কাউকে কিছু ভাবতে হবে না।
শুধু তাঁর ছেলে আর মেয়েটা একদিন বুক ফুলিয়ে, মাথা উঁচু করে বলতে পারবে—
“আমার বাবা তোমাদের মাঝে জ্ঞানের আলো দান করেছিলো।
নিজের সংসারের অভাব ভুলে তোমাদের সন্তানদের হাতে বই তুলে দিয়েছিলো।
তোমাদের অন্ধকার দূর করতে নিজের ঘরের আলো নিভিয়েছিলো।
কিন্তু তোমরা তাঁকে তাঁর প্রাপ্য সম্মান দাওনি—তোমরা তাঁকে বিক্রি করেছিলে মুরগির হাটে!” আবু সুফিয়ান হারিয়ে যাননি।
নক্ষত্র কখনো মরে না—
শুধু আমাদের চোখের আড়ালে চলে যায়। সুফিয়ানও চলে গেছে।
কিন্তু দর্শনার আকাশে, বইয়ের পাতায়, কিছু মানুষের স্মৃতিতে এবং তাঁর সন্তানদের বুকের গভীরে— এখনও আলো হয়ে জ্বলছে।
আর হয়তো কোনো এক অদৃশ্য দরবারে তাঁর জন্য লেখা হচ্ছে অন্য এক হিসাব—
যাঁরা তাঁকে ভালোবেসেছেন, যাঁরা তাঁর সঙ্গে পথ হেঁটেছেন, যাঁরা তাঁর হাসি-কথা-আচরণে নিজেদের জীবনের কোনো একটি সুন্দর মুহূর্ত খুঁজে পেয়েছেন—তাঁদের স্মৃতিতে ও নিশ্চয় বেঁচে থাকবে। তাদের কারো কারো চোখ ভিজবে, বুক ভার হবে, স্মৃতির দরজা খুলবে বারবার। তারপর কোনো এক নির্জন রাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে হবে—
ওই যে একটি নক্ষত্র একটু বেশি উজ্জ্বল হয়ে জ্বলছে, সেটাই হয়তো আবু সুফিয়ান।
-আব্দুস সামাদ আজাদ বিপু বিশেষ প্রতিবেদক, নির্ভীক সংবাদ, নির্বাহী সম্পাদক, অল ইভেন্ট নিউজ এজেন্সি Bangladesh correspondent, OTV UK
E-mail:bepubd@gmail.com
নির্ভীক সংবাদ ডেস্ক 
























