খুলনা অঞ্চলের জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই) ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে চলমান দুর্নীতি, টেন্ডারবাজি ও অনিয়মের অভিযোগ নতুন করে সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র, স্থানীয় বাসিন্দা, জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে—সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের নামে নিম্নমানের কাজ, বরাদ্দে বৈষম্য, স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার অনিয়ম সংঘটিত হচ্ছে।
বিশেষ করে খুলনা সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জামানুর রহমানের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, যা জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর আস্থা কমিয়ে দিয়েছে এবং উপকূলীয় অঞ্চলে সুপেয় পানির সংকটকে আরও প্রকট করে তুলেছে।
তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে টেন্ডারবাজি ও সম্পদ অর্জনের অভিযোগ
খুলনা সার্কেলে দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে দায়িত্ব পালনকালে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জামানুর রহমানের বিরুদ্ধে দলবাজি, টেন্ডারবাজি ও অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী:
পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিতে টেন্ডার প্রক্রিয়া প্রভাবিত করা হয়েছে
নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হলেও পূর্ণ বিল অনুমোদন দেওয়া হয়েছে
প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম তুলে ধরলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে
একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “যদি কেউ বিল আটকে দেয় বা অনিয়মের প্রতিবাদ করে, তাহলে তাকে বিভিন্নভাবে হেনস্তা করা হয়।”
নিম্নমানের কাজ: প্রকল্পের স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন
বিভিন্ন প্রকল্পে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে:
পানির ট্যাংক নির্মাণের কিছুদিন পরই ফাটল দেখা দিয়েছে
পাইপলাইন স্থাপনের পরপরই লিকেজ শুরু হয়েছে
নলকূপ স্থাপনের পর পানি ব্যবহারযোগ্য নয়
এতে করে সরকারি অর্থ ব্যয়ের পরও জনগণ কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
নলকূপ বরাদ্দে অনিয়ম: বৈষম্যের অভিযোগ
সরকারি নলকূপ বরাদ্দেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রকৃত চাহিদার ভিত্তিতে নয়, বরং ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও রাজনৈতিক বিবেচনায় বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে।
অভিযোগের চিত্র:
কিছু ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি নলকূপ বরাদ্দ
অনেক এলাকায় চাহিদা থাকা সত্ত্বেও বরাদ্দ না পাওয়া
তালিকা প্রণয়নে স্বচ্ছতার অভাব
চলতি অর্থবছরেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
একজন গ্রামবাসী বলেন, “আমাদের এলাকায় পানির খুব সংকট, কিন্তু কোনো নলকূপ পাইনি। অন্যদিকে পাশের এলাকায় প্রয়োজন না থাকলেও একাধিক নলকূপ দেওয়া হয়েছে।”
উপকূলীয় প্রকল্পে অনিয়ম: পানি সংকট আরও তীব্র
খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের উপকূলীয় অঞ্চলে সুপেয় পানির সংকট দীর্ঘদিনের সমস্যা। এই সংকট নিরসনে নেওয়া বিভিন্ন প্রকল্পেও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগকৃত প্রকল্পসমূহ:
দাকোপ উপজেলায় নদী খনন প্রকল্প
বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ প্রকল্প
পানির ট্যাংক বণ্টন কর্মসূচি
অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রকল্পে:
প্রকৃত কাজ না করেই বিল উত্তোলন করা হয়েছে
নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে
প্রকল্পের সুবিধাভোগী নির্ধারণে অনিয়ম হয়েছে
সাতক্ষীরা জেলায় এক নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে প্রায় ২০০ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল, যা পরবর্তীতে প্রশাসনিক বদলির মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়।
স্বজনপ্রীতি ও বদলি বাণিজ্য
অধিদপ্তরের অভ্যন্তরেও স্বজনপ্রীতি ও বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী:
পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া
ঘুষের বিনিময়ে পদোন্নতি ও বদলি
যোগ্যতার পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রভাবকে গুরুত্ব দেওয়া
এতে করে দক্ষতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে কাজের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
দীর্ঘদিনের অভিযোগ, তবুও কার্যকর ব্যবস্থা নেই
খুলনা অঞ্চলে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নতুন নয়। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে একাধিক সংবাদমাধ্যমে এসব অনিয়ম নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও কার্যকর পদক্ষেপের অভাব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের গণশুনানিতে বিভিন্ন দপ্তরের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও এই অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে বড় ধরনের তদন্ত এখনো দৃশ্যমান নয়।
পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের অনিয়মের সরাসরি প্রভাব পড়ছে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর।
প্রভাবসমূহ:
উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি
সুপেয় পানির সংকট তীব্রতর হওয়া
পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি
কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব
একজন পরিবেশবাদী বলেন, “পানির মতো মৌলিক প্রয়োজনীয়তায় যদি দুর্নীতি হয়, তাহলে মানুষের বেঁচে থাকাই কঠিন হয়ে পড়ে।”
স্থানীয়দের ক্ষোভ
খুলনা অঞ্চলের সাধারণ মানুষ এই পরিস্থিতি নিয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, উন্নয়ন প্রকল্পের নামে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলেও বাস্তবে কোনো সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।
একজন বাসিন্দা বলেন, “প্রকল্প হয়, উদ্বোধন হয়, কিন্তু কয়েক মাস পর সবকিছু ভেঙে পড়ে। এতে শুধু টাকা নষ্ট হয়।”
জবাবদিহিতার সংকট
সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে উঠে এসেছে জবাবদিহিতার অভাব। অভিযোগ উঠলেও:
তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা
দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তির অভাব
রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে ব্যবস্থা না নেওয়া
এই পরিস্থিতি দুর্নীতিকে আরও উৎসাহিত করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
করণীয়: কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা
বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের সুপারিশ করেছেন:
১. টেন্ডার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা
ই-টেন্ডারিং বাধ্যতামূলক করে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
২. প্রকল্প মনিটরিং জোরদার
স্বাধীন তদারকি সংস্থা দিয়ে প্রকল্পের কাজ পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
৩. অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি
দুদক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত তদন্ত ও ব্যবস্থা নিতে হবে।
৪. স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততা
প্রকল্প বাস্তবায়নে স্থানীয়দের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
৫. কঠোর শাস্তি
দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
উপসংহার
খুলনা অঞ্চলের জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে দুর্নীতি ও অনিয়মের যে চিত্র উঠে এসেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। পানি ও স্যানিটেশন খাত মানুষের মৌলিক অধিকার সংশ্লিষ্ট, সেখানে এই ধরনের অনিয়ম কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
সচেতন মহলের দাবি—দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় উপকূলীয় অঞ্চলের পানি সংকট আরও তীব্র হবে এবং এর ভয়াবহ প্রভাব পড়বে জনজীবনে।
সংবাদ শিরোনাম
খুলনায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে টেন্ডারবাজি, অনিয়ম ও দুর্নীতির বিস্তৃত অভিযোগ: সুপেয় পানির সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা
-
মোঃশাহীন হোসেন, খুলনা অফিস - আপলোড সময় ০২:১৪:১৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৬ মে ২০২৬
- 44
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ


























