ঢাকা ০৬:৫৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬, ৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
মাস্টার্স পাস করে বাসের চালক রাবেয়া, প্রচলিত ধারণা বদলের প্রত্যয় খুলনায় গণপিটুনিতে শিশু অপহরণকারী নিহত সাতক্ষীরার ব্রহ্মরাজপুর গাছ কেটে রাস্তা নির্মাণে বাঁধা দিলে প্রতিপক্ষের হামলায় ১ জন গুরুত্বর জখম গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নিয়ে আড়াই বছর ধরে থানায় থানায় চাকরি, হদিস নেই এএসআই মোতালেবের খুলনায় অস্ত্র ও গুলিসহ শুটার বেলু গ্রেপ্তার খুলনায় স্বেচ্ছাসেবক দলের বহিস্কৃত নেতা মিঠু গ্রেফতার ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে খুলনা জেলা আইনজীবী থানা জামায়াতের  সেক্রেটারি এডভোকেট লিয়াকত আলীর ইন্তিকাল তালায় ‎দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস বিষয়ে প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত তালায় অসুস্থ্য গৃহবধূকে ধর্ষন মামলায় নারীসহ আটক- ২ তালায় নানান আয়োজনে জাতীয় মৎস্য পক্ষ উদ্বোধন

মাস্টার্স পাস করে বাসের চালক রাবেয়া, প্রচলিত ধারণা বদলের প্রত্যয়

মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জনের পর অনেকেই যখন প্রচলিত পেশায় ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্ন দেখেন, তখন সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছেন মোসা. রাবেয়া খাতুন। উচ্চশিক্ষিত এই নারী পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন বাস চালানো। পরিবারের আপত্তি, সামাজিক নানা প্রশ্ন কিংবা প্রচলিত ধারণা—কোনোটিই তাঁর সিদ্ধান্তের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। বরং বিষয়টিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নে এগিয়ে চলেছেন তিনি।

মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বিআরটিসির ঢাকা ট্রাক ডিপো প্রাঙ্গণে নারীদের জন্য বিশেষ ‘মহিলা বাস সার্ভিস (পিংক বাস)’-এর উদ্বোধন করা হয়। এই সার্ভিসের চালকদের মধ্যে রয়েছেন রাবেয়া খাতুনও। পেশা হিসেবে বাস চালানোর সিদ্ধান্ত, পরিবারের প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে তিনি কথা বলেছেন নিজের অভিজ্ঞতা ও প্রত্যয়ের কথা।

রাবেয়া খাতুন জানান, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সরকারি তিতুমীর কলেজ থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেছেন। উচ্চশিক্ষা শেষ করার পর বাসচালকের পেশা বেছে নেওয়ায় পরিবারের অনেকেই বিস্মিত হয়েছেন। তাঁদের প্রশ্ন—মাস্টার্স পাস করা একজন নারী কেন বাস চালাবেন?

রাবেয়ার ভাষায়, পরিবারের মানুষ কখনোই তাঁর এই সিদ্ধান্তকে সহজভাবে মেনে নেয়নি। তাঁদের ধারণা, একজন মাস্টার্স পাস নারীর জন্য বাসচালকের পেশা উপযুক্ত নয়। কিন্তু রাবেয়া মনে করেন, পেশার মর্যাদা নির্ভর করে কাজের ধরন কিংবা সামাজিক প্রচলিত ধারণার ওপর নয়; বরং একজন মানুষ কীভাবে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজটি করছেন, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, “এই কাজটাকে আমি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি। পরিবার তো আসলে কখনোই এর পক্ষে না। তারা বলছেন, আমি মাস্টার্স পাস। ঢাকা ইউনিভার্সিটির অধীনে তিতুমীর কলেজ থেকে মাস্টার্স পাস করেছি। সেহেতু তাদের ধারণা, বাংলাদেশ আসলে এটা ডিজার্ভ করে না যে একজন মাস্টার্স পাস মেয়ে একজন চালক হিসেবে কাজ করবে।”

তবে রাবেয়া নিজের পরিচয়কে কেবল ‘চালক’ হিসেবে দেখতে নারাজ। তিনি মনে করেন, বাস চালানোর দায়িত্বও অন্য যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ পেশার মতোই সম্মানজনক। তাই তিনি নিজেকে চালক না ভেবে ‘পাইলট’ হিসেবে ভাবতে চান।

রাবেয়া বলেন, “কিন্তু এটাকে চালক না ভেবে যদি আমি নিজেকে পাইলট ভাবি, তাহলে আমার অপরাধটা কী? কোনো অপরাধ নাই। আমি তো এটাই ভেবে কাজ করতে পারি।”

ড্রাইভিং পেশার সঙ্গে তাঁর পরিচয় অবশ্য একেবারে নতুন নয়। কর্মজীবনে ব্র্যাকের সঙ্গে যুক্ত থাকার সময় তিনি দেখেছেন, অনেক উচ্চশিক্ষিত তরুণ-তরুণী ড্রাইভিং শিখে দেশে-বিদেশে নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করছেন। অনেকে বিদেশে গিয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি ড্রাইভিং করে নিজেদের খরচ চালাচ্ছেন।

রাবেয়া বলেন, বিদেশে গিয়ে অনেকে নিজের পড়াশোনা ও জীবনযাপনের ব্যয় নিজেরাই বহন করেন। ড্রাইভিংকে তাঁরা ছোট পেশা হিসেবে দেখেন না। বরং শ্রম ও দক্ষতার মাধ্যমে নিজেদের স্বাবলম্বী করে তোলেন।

সেখান থেকেই রাবেয়ার প্রশ্ন—বিদেশে গিয়ে যদি শিক্ষিত মানুষ ড্রাইভিংকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন, তাহলে বাংলাদেশে কেন পারবেন না?

তাঁর মতে, বাংলাদেশের সমাজে এখনো অনেক পেশাকে সামাজিক মর্যাদার বিচারে মূল্যায়ন করা হয়। ফলে উচ্চশিক্ষিত কেউ প্রচলিত পেশার বাইরে গেলেই নানা প্রশ্ন ওঠে। এই মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন। আর সেই পরিবর্তনের অংশ হতে চান তিনি নিজেই।

রাবেয়ার বক্তব্য, “তো এটা যদি বহির্বিশ্বে গিয়ে আমরা করতে পারি, তাহলে বাংলাদেশে এটা কেন করতে পারবো না?”

তাঁর কাছে বাস চালানো শুধু জীবিকা অর্জনের পথ নয়; বরং নারীর কর্মসংস্থান, আত্মনির্ভরতা এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের একটি মাধ্যম। বিশেষ করে নারীদের জন্য চালু হওয়া ‘পিংক বাস সার্ভিস’-এ কাজ করার সুযোগকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন।

রাবেয়া বলেন, “আমরাই নতুন করে সৃষ্টি করবো, আমরা আমাদের দেশটাকে চেঞ্জ করার চেষ্টা করবো, যদি নতুন কিছু করা যায়। আমি সেটার লক্ষ্যেই আছি।”

রাবেয়ার এই সিদ্ধান্ত একদিকে যেমন প্রচলিত সামাজিক ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে, অন্যদিকে তেমনি উচ্চশিক্ষিত নারীদের কর্মক্ষেত্রের পরিধি নিয়েও নতুন করে ভাবনার সুযোগ তৈরি করেছে। তাঁর কাছে পেশার পরিচয়ের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজের দক্ষতা কাজে লাগানো, সম্মানের সঙ্গে উপার্জন করা এবং সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের চেষ্টা করা।

মাস্টার্স ডিগ্রিধারী হয়েও বাসের স্টিয়ারিং হাতে নেওয়া রাবেয়া খাতুন তাই শুধু একজন বাসচালক নন; তিনি প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে নিজের পছন্দের পেশাকে মর্যাদা দেওয়ার এক সাহসী উদাহরণ। তাঁর প্রত্যাশা, একদিন সমাজে মানুষ পেশার ছোট-বড় বিচার না করে কাজের মর্যাদা ও মানুষের যোগ্যতাকে মূল্যায়ন করবে।

Tag :
About Author Information

Nirvik Sangbad

জনপ্রিয় সংবাদ

মাস্টার্স পাস করে বাসের চালক রাবেয়া, প্রচলিত ধারণা বদলের প্রত্যয়

মাস্টার্স পাস করে বাসের চালক রাবেয়া, প্রচলিত ধারণা বদলের প্রত্যয়

আপলোড সময় ১০:৫৯:২২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬

মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জনের পর অনেকেই যখন প্রচলিত পেশায় ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্ন দেখেন, তখন সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছেন মোসা. রাবেয়া খাতুন। উচ্চশিক্ষিত এই নারী পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন বাস চালানো। পরিবারের আপত্তি, সামাজিক নানা প্রশ্ন কিংবা প্রচলিত ধারণা—কোনোটিই তাঁর সিদ্ধান্তের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। বরং বিষয়টিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নে এগিয়ে চলেছেন তিনি।

মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বিআরটিসির ঢাকা ট্রাক ডিপো প্রাঙ্গণে নারীদের জন্য বিশেষ ‘মহিলা বাস সার্ভিস (পিংক বাস)’-এর উদ্বোধন করা হয়। এই সার্ভিসের চালকদের মধ্যে রয়েছেন রাবেয়া খাতুনও। পেশা হিসেবে বাস চালানোর সিদ্ধান্ত, পরিবারের প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে তিনি কথা বলেছেন নিজের অভিজ্ঞতা ও প্রত্যয়ের কথা।

রাবেয়া খাতুন জানান, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সরকারি তিতুমীর কলেজ থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেছেন। উচ্চশিক্ষা শেষ করার পর বাসচালকের পেশা বেছে নেওয়ায় পরিবারের অনেকেই বিস্মিত হয়েছেন। তাঁদের প্রশ্ন—মাস্টার্স পাস করা একজন নারী কেন বাস চালাবেন?

রাবেয়ার ভাষায়, পরিবারের মানুষ কখনোই তাঁর এই সিদ্ধান্তকে সহজভাবে মেনে নেয়নি। তাঁদের ধারণা, একজন মাস্টার্স পাস নারীর জন্য বাসচালকের পেশা উপযুক্ত নয়। কিন্তু রাবেয়া মনে করেন, পেশার মর্যাদা নির্ভর করে কাজের ধরন কিংবা সামাজিক প্রচলিত ধারণার ওপর নয়; বরং একজন মানুষ কীভাবে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজটি করছেন, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, “এই কাজটাকে আমি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি। পরিবার তো আসলে কখনোই এর পক্ষে না। তারা বলছেন, আমি মাস্টার্স পাস। ঢাকা ইউনিভার্সিটির অধীনে তিতুমীর কলেজ থেকে মাস্টার্স পাস করেছি। সেহেতু তাদের ধারণা, বাংলাদেশ আসলে এটা ডিজার্ভ করে না যে একজন মাস্টার্স পাস মেয়ে একজন চালক হিসেবে কাজ করবে।”

তবে রাবেয়া নিজের পরিচয়কে কেবল ‘চালক’ হিসেবে দেখতে নারাজ। তিনি মনে করেন, বাস চালানোর দায়িত্বও অন্য যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ পেশার মতোই সম্মানজনক। তাই তিনি নিজেকে চালক না ভেবে ‘পাইলট’ হিসেবে ভাবতে চান।

রাবেয়া বলেন, “কিন্তু এটাকে চালক না ভেবে যদি আমি নিজেকে পাইলট ভাবি, তাহলে আমার অপরাধটা কী? কোনো অপরাধ নাই। আমি তো এটাই ভেবে কাজ করতে পারি।”

ড্রাইভিং পেশার সঙ্গে তাঁর পরিচয় অবশ্য একেবারে নতুন নয়। কর্মজীবনে ব্র্যাকের সঙ্গে যুক্ত থাকার সময় তিনি দেখেছেন, অনেক উচ্চশিক্ষিত তরুণ-তরুণী ড্রাইভিং শিখে দেশে-বিদেশে নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করছেন। অনেকে বিদেশে গিয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি ড্রাইভিং করে নিজেদের খরচ চালাচ্ছেন।

রাবেয়া বলেন, বিদেশে গিয়ে অনেকে নিজের পড়াশোনা ও জীবনযাপনের ব্যয় নিজেরাই বহন করেন। ড্রাইভিংকে তাঁরা ছোট পেশা হিসেবে দেখেন না। বরং শ্রম ও দক্ষতার মাধ্যমে নিজেদের স্বাবলম্বী করে তোলেন।

সেখান থেকেই রাবেয়ার প্রশ্ন—বিদেশে গিয়ে যদি শিক্ষিত মানুষ ড্রাইভিংকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন, তাহলে বাংলাদেশে কেন পারবেন না?

তাঁর মতে, বাংলাদেশের সমাজে এখনো অনেক পেশাকে সামাজিক মর্যাদার বিচারে মূল্যায়ন করা হয়। ফলে উচ্চশিক্ষিত কেউ প্রচলিত পেশার বাইরে গেলেই নানা প্রশ্ন ওঠে। এই মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন। আর সেই পরিবর্তনের অংশ হতে চান তিনি নিজেই।

রাবেয়ার বক্তব্য, “তো এটা যদি বহির্বিশ্বে গিয়ে আমরা করতে পারি, তাহলে বাংলাদেশে এটা কেন করতে পারবো না?”

তাঁর কাছে বাস চালানো শুধু জীবিকা অর্জনের পথ নয়; বরং নারীর কর্মসংস্থান, আত্মনির্ভরতা এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের একটি মাধ্যম। বিশেষ করে নারীদের জন্য চালু হওয়া ‘পিংক বাস সার্ভিস’-এ কাজ করার সুযোগকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন।

রাবেয়া বলেন, “আমরাই নতুন করে সৃষ্টি করবো, আমরা আমাদের দেশটাকে চেঞ্জ করার চেষ্টা করবো, যদি নতুন কিছু করা যায়। আমি সেটার লক্ষ্যেই আছি।”

রাবেয়ার এই সিদ্ধান্ত একদিকে যেমন প্রচলিত সামাজিক ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে, অন্যদিকে তেমনি উচ্চশিক্ষিত নারীদের কর্মক্ষেত্রের পরিধি নিয়েও নতুন করে ভাবনার সুযোগ তৈরি করেছে। তাঁর কাছে পেশার পরিচয়ের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজের দক্ষতা কাজে লাগানো, সম্মানের সঙ্গে উপার্জন করা এবং সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের চেষ্টা করা।

মাস্টার্স ডিগ্রিধারী হয়েও বাসের স্টিয়ারিং হাতে নেওয়া রাবেয়া খাতুন তাই শুধু একজন বাসচালক নন; তিনি প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে নিজের পছন্দের পেশাকে মর্যাদা দেওয়ার এক সাহসী উদাহরণ। তাঁর প্রত্যাশা, একদিন সমাজে মানুষ পেশার ছোট-বড় বিচার না করে কাজের মর্যাদা ও মানুষের যোগ্যতাকে মূল্যায়ন করবে।