একটি বিলাসবহুল ক্রুজ শিপ। নাম ‘হোনডাস।’ মাঝসমুদ্রে এই প্রমোদতরীতে হঠাৎ মরণঘাতী হান্টাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। ভাইরাসের কবলে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নিশ্চিত করেছে, জাহাজের অন্তত সাতজন যাত্রী হান্টাভাইরাসের ‘আন্দিজ’ ধরনে আক্রান্ত। আরও দুজনের শরীরে এই ভাইরাসের উপস্থিতি রয়েছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি করেছে। কারণ, ওই জাহাজের যাত্রীরা এরইমধ্যে বিশ্বের অন্তত ২০টি দেশে ফিরে গেছেন। এটি সাধারণ স্বাস্থ্যগত সংকট নয়। এটি বৈশ্বিক যোগাযোগ, স্বাস্থ্য নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির জন্য এক নতুন পরীক্ষাও বটে।
হান্টাভাইরাস সাধারণত ইঁদুরের মলমূত্র বা লালা থেকে ছড়ায়। কিন্তু এবারের চিত্রটি কিছুটা ভিন্ন। চিকিৎসকরা বলছেন, খুব কাছাকাছি সংস্পর্শে এলে এই ভাইরাসের আন্দিজ ধরনটি মানুষ থেকে মানুষে ছড়াতে পারে। এটি অত্যন্ত বিরল একটি ঘটনা। এর প্রাণঘাতী ক্ষমতা বা মৃত্যুর হার অনেক বেশি। ফলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আপাতত সাধারণ মানুষের জন্য ঝুঁকি কম বললেও, চরম সতর্কতা অবলম্বন করতে হচ্ছে। সন্দেহভাজন যাত্রীদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও নিবিড় পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এই সতর্কতা মোটেও বাড়াবাড়ি নয়।
একেক দেশ পরিস্থিতি সামাল দিতে একেক ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে। জার্মানিতে চারজন যাত্রীকে ফ্রাঙ্কফুর্টের একটি ক্লিনিকে কঠোর কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। অথচ তাদের শরীরে এখনো কোনো উপসর্গ নেই। জার্মানির মতো দেশগুলো ইবোলা বা লাসা ভাইরাসের মতো ভয়ংকর রোগের জন্য তৈরি বিশেষ আইসোলেশন ইউনিট ব্যবহার করছে। চিকিৎসকরা বিশেষায়িত হ্যাজমাট স্যুট পরে রোগীদের কাছে যাচ্ছেন। ৪২ দিনের দীর্ঘ কোয়ারেন্টাইনের কথাও বলা হচ্ছে। অন্যদিকে, বিশ্বের অন্যান্য দেশ যাত্রীদের কেবল হোম কোয়ারেন্টাইনে পাঠাচ্ছে। এই ভিন্ন ভিন্ন পদক্ষেপ প্রমাণ করে, বৈশ্বিক স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। প্রতিটি দেশের স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ তাদের নিজস্ব সক্ষমতা ও কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। যাদের উন্নত অবকাঠামো আছে, তারা চরম সতর্কতা নিচ্ছে। আর যাদের নেই, তারা সাধারণ পদ্ধতির ওপর নির্ভর করছে।
কোভিড-১৯ মহামারির স্মৃতি এখনও মানুষের মনে তাজা। ওই সময় আমাদের মতো দেশগুলো ভ্যাকসিন পলিসির ফাঁকে ভ্যাকসিন পলিটিক্সে ঢুকে পড়ে। টিকা উৎপাদনকারী সব দেশকে খুশি রাখতে গিয়ে ‘শ্যাম রাখি না কুল রাখি’ অবস্থা তৈরি হয়। ফলে নতুন কোনো ভাইরাসের খবর এলেই জনমনে আতঙ্ক তৈরি হয়। তবে মহামারি বিশেষজ্ঞরা আশ্বস্ত করছেন। তাদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি কোভিডের মতো নয়। কোভিডের শুরুতে ভাইরাসটি সবার কাছে অচেনা ছিল। এটি বাতাসে ভাসমান কণার মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ত। কিন্তু হান্টাভাইরাস বিজ্ঞানীদের কাছে বেশ পরিচিত। এর সংক্রমণ পদ্ধতি এবং প্রতিরোধ ব্যবস্থা সম্পর্কে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক তথ্য রয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, এই সংক্রমণের উৎস নির্দিষ্ট। ক্রুজ শিপের যাত্রীদের কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং বা সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের শনাক্ত করা খুবই সহজ। যতক্ষণ পর্যন্ত সংক্রমণের উৎস ট্রেস করা যাচ্ছে, ততক্ষণ এটি বড় মহামারির রূপ নেওয়ার আশঙ্কা নেই। কিন্তু যদি এমন কোনো রোগী পাওয়া যায়, যার সঙ্গে ওই জাহাজের কোনো সম্পর্ক নেই, তখন পরিস্থিতি সত্যিই উদ্বেগের কারণ হবে।
এই ঘটনার কিছু সুদূরপ্রসারী ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। প্রথমত, ক্রুজ শিপ বা প্রমোদতরীগুলো বিশ্বায়নের একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ। বিভিন্ন দেশের নাগরিকরা একটি আবদ্ধ জায়গায় দীর্ঘসময় অবস্থান করেন। ফলে সেখানে যে কোনো প্রাদুর্ভাব মুহূর্তের মধ্যে আন্তর্জাতিক রূপ নেয়। যাত্রীদের ২০টি দেশে ফিরে যাওয়ার অর্থ হলো, একই সঙ্গে ২০টি আলাদা রাষ্ট্রের সীমান্ত, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা এবং জাতীয় নিরাপত্তা একযোগে পরীক্ষার মুখে পড়া। বিশ্বায়নের যুগে কোনো দেশই আর বিচ্ছিন্ন নয়।
দ্বিতীয়ত, বৈশ্বিক স্বাস্থ্য কূটনীতির বিষয়টি নতুন করে সামনে আসছে। ভাইরাসের কোনো নির্দিষ্ট পাসপোর্ট নেই। এটি কোনো দেশের রাজনৈতিক সীমান্ত চেনে না। এই সংকট মোকাবিলায় রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক তথ্য বিনিময়ের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। কোনো দেশ যদি নিজেদের পর্যটন বা বাণিজ্য বাঁচাতে তথ্য গোপন করে, তবে পুরো বিশ্ব বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে। এখানে রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক আস্থার অভাব এবং ভূরাজনৈতিক অবিশ্বাস বড় সংকট তৈরি করতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈশ্বিক নেতৃত্ব এখানে একটি বড় পরীক্ষার সম্মুখীন।
তৃতীয়ত, উন্নত এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের মধ্যকার সক্ষমতার বৈষম্য এই ঘটনার মাধ্যমে আরও স্পষ্ট হয়েছে। জার্মানির মতো উন্নত দেশের কাছে অত্যাধুনিক বায়ো-কন্টেইনমেন্ট ইউনিট রয়েছে। কিন্তু উন্নয়নশীল বা অনুন্নত দেশগুলোর সেই সক্ষমতা নেই। এই স্বাস্থ্যগত বৈষম্য ভবিষ্যতে ভূরাজনৈতিক মেরুকরণ আরও বাড়াবে। দুর্বল স্বাস্থ্য অবকাঠামোর দেশগুলো ভাইরাসের হটস্পটে পরিণত হতে পারে। তখন উন্নত বিশ্ব তাদের ওপর কঠোর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা বা বাণিজ্য অবরোধ আরোপ করতে পারে। এটি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বৈষম্যকে আরও গভীর করবে।
চতুর্থত, অর্থনৈতিক সুরক্ষাবাদ বৃদ্ধির আশঙ্কা। বিশ্ব অর্থনীতি এখনো কোভিডের ধাক্কা পুরোপুরি সামলে উঠতে পারেনি। নতুন করে কোনো ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করতে পারে। বৈশ্বিক পর্যটন ও এভিয়েশন শিল্প পুনরায় বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে। রাষ্ট্রগুলো নিজেদের অর্থনীতি বাঁচাতে সীমানা বন্ধ করে দিতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক মুক্তবাণিজ্য চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হবে।
পঞ্চমত, চিকিৎসা কূটনীতি বা ‘ভ্যাকসিন ডিপ্লোম্যাসি’ আন্তর্জাতিক মেরুকরণের নতুন হাতিয়ার হয়ে উঠবে। শক্তিশালী দেশগুলো দ্রুত এর প্রতিষেধক বা ওষুধ আবিষ্কারের প্রতিযোগিতায় নামবে। এসব জীবনরক্ষাকারী সামগ্রী ভূরাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। মিত্র দেশগুলো হয়তো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এসব সরবরাহ পাবে। অন্যদিকে প্রতিপক্ষ দেশগুলোকে এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত করার কৌশল নেওয়া হতে পারে। চিকিৎসাসামগ্রীর বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া পরাশক্তিগুলোর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়াবে।
ষষ্ঠত, বহুপাক্ষিক বৈশ্বিক জোটের বদলে আঞ্চলিক জোটগুলোর প্রভাব আরও বৃদ্ধি পাবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে পারে। এর ফলে বিভিন্ন অঞ্চল নিজেদের মতো করে ‘বায়ো-সিকিউরিটি প্যাক্ট’ বা জৈব-নিরাপত্তা চুক্তি গঠন করতে পারে। সামরিক ও কৌশলগত জোটগুলো তাদের কাজের পরিধিতে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষাকে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত করবে। এতে বৈশ্বিক সহযোগিতা কমে গিয়ে বিশ্বব্যবস্থা আরও বেশি খণ্ডিত ও আঞ্চলিকীকরণ হয়ে পড়বে।
সপ্তমত, আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন ও বৈশ্বিক বন্দর ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সংক্রামক ব্যাধির অজুহাতে অনেক দেশ তাদের বন্দরে বিদেশি জাহাজ প্রবেশের অনুমতি বাতিল করতে পারে। এর প্রভাব শুধু প্রমোদতরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বৈশ্বিক পণ্য পরিবহন বা কার্গো সাপ্লাই চেইন মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। সমুদ্রপথে বাণিজ্যের স্বাধীনতা এবং ‘ফ্রিডম অব নেভিগেশন’ নিয়ে নতুন আন্তর্জাতিক আইনি বিরোধ দেখা দেবে।
অষ্টমত, তথ্যপ্রবাহ ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে এই ঘটনা নতুন কিছু চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। বৈশ্বিক উত্তেজনার কারণে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক দোষারোপ বা ষড়যন্ত্র তত্ত্বের বিস্তৃতি ঘটার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসমর্থিত তথ্য বা গুজব ছড়িয়ে পড়ার কারণে জনমনে বিভ্রান্তি ও অহেতুক আতঙ্ক তৈরি হতে পারে। এ ধরনের অপতথ্য বা ভুল তথ্য সমাজের স্বাভাবিক ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, যা যে কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলার জন্য উদ্বেগের কারণ। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারগুলোর জন্য একটি কার্যকর, দায়িত্বশীল ও স্বচ্ছ তথ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠবে।
সবশেষে, জাতীয় নিরাপত্তার প্রচলিত ধারণা এখন অনেকখানি বদলে গেছে। কেবল সামরিক শক্তি বা পারমাণবিক অস্ত্র দিয়ে এখন আর রাষ্ট্রকে নিরাপদ রাখা সম্ভব নয়। বায়ো-সিকিউরিটি বা জৈব নিরাপত্তা এখন আধুনিক রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। কোনো দেশ তার নাগরিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা দিতে কতটা সক্ষম, তার ওপর বিশ্বমঞ্চে সেই দেশের প্রভাব নির্ভর করে।
আশা করা যায়, হান্টাভাইরাসের এই প্রাদুর্ভাব হয়তো শেষ পর্যন্ত বড় কোনো মহামারি তৈরি করবে না। কিন্তু এটি বিশ্বনেতাদের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। ভবিষ্যৎ মহামারি মোকাবিলায় রাষ্ট্রগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক ও ভূরাজনৈতিক প্রস্তুতি কতটা মজবুত, এই ঘটনা তারই একটি বাস্তব প্রমাণ নেওয়ার প্রস্তুতি হয়ত নিচ্ছে।
সৈয়দ রাইয়ান আমীর 























