মাদক, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বাড়ছে সহিংসতা; জনমনে আতঙ্ক, আরও কঠোর অভিযানের দাবি
খুলনা মহানগর ও জেলায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। গত ১৫ দিনের বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যৌথ বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে বিপুলসংখ্যক গ্রেপ্তার হলেও শীর্ষ সন্ত্রাসী চক্রের মূল হোতারা এখনো অধিকাংশই ধরাছোঁয়ার বাইরে। ফলে জনমনে নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্ক কাটছে না।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ৪ থেকে ৬ জুন পর্যন্ত টানা তিন দিনের বিশেষ অভিযানে মোট ১৮৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪ জুন ৬৩ জন, ৫ জুন ৫৯ জন এবং ৬ জুন ৬২ জনকে আটক করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে কয়েকজন তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী থাকলেও অধিকাংশই মাদক ব্যবসায়ী, মাদকসেবী, চুরি এবং বিভিন্ন মামলার আসামি। অভিযানে দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে এবং একটি মোটরসাইকেল ও একটি পিকআপ জব্দ করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক অভিযানে আলোচিত সন্ত্রাসী চক্র ‘বি-কোম্পানি’-এর সহযোগী রাফসান মাহমুদ ওরফে পার্থ, গ্রুপটির নেতার এক ভাইসহ মোট ২৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
৯টি সক্রিয় সন্ত্রাসী গ্রুপের দৌরাত্ম্য
খুলনা মহানগর ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় বর্তমানে অন্তত ৯টি সক্রিয় সন্ত্রাসী গ্রুপ রয়েছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য। এগুলো হলো— বি-কোম্পানি, পলাশ গ্রুপ, হুমা বাহিনী, আশিক বাহিনী, নূর আজিম গ্রুপ, টেংকি শাওন গ্রুপ, আরমান গ্রুপ, শাকিল গ্রুপ এবং নাসিম গ্রুপ।
এসব গ্রুপের বিরুদ্ধে খুন, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, দখলবাজি এবং আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিভিন্ন এলাকায় এসব গ্রুপের প্রভাব এখনো বিদ্যমান থাকায় সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
হত্যাকাণ্ডে উদ্বেগ
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত খুলনা নগরে ১৬টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত এ সংখ্যা বেড়ে ১৭টিতে পৌঁছায়। এছাড়া গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে সংঘটিত ৩৪টি হত্যাকাণ্ডে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে মাদক সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি এবং এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্ব প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করছে।
পুলিশের উদ্যোগ
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে লবণচরা থানার জিন্নাহপাড়া, পুটিমারি, শিশুবাগান আশি বিঘা ও কৃষ্ণনগর এলাকায় চারটি অস্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন করা হয়েছে।
এ ছাড়া অপরাধপ্রবণ এলাকায় ২৪ ঘণ্টা টহল জোরদার, বিভিন্ন ফাঁড়িতে জনবল বৃদ্ধি এবং স্থানীয়দের নিয়ে মাদক ও সন্ত্রাসবিরোধী কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পুলিশ কমিশনার জানিয়েছেন, কিশোর গ্যাং, মাদক, ছিনতাই ও সন্ত্রাস দমনে পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে এবং এ ধরনের অপরাধ নির্মূলে অভিযান অব্যাহত থাকবে।
জনগণের উদ্বেগ
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে অনেককে গ্রেপ্তার করা হলেও শীর্ষ সন্ত্রাসীরা দীর্ঘদিন ধরেই অধরা। ফলে তাদের অনুসারীরা বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় থেকে অপরাধ সংঘটনের সুযোগ পাচ্ছে।
সুজন, আমাদের এ প্রতিনিধি বলেন, “সবকিছু পুলিশের নখদর্পণে থাকলেও কার্যকর পদক্ষেপ আরও জোরদার করা প্রয়োজন। শুধু ছোট অপরাধীদের নয়, চিহ্নিত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনতে হবে।”
জনগণের দাবি
নাগরিক সমাজ ও স্থানীয়দের দাবির মধ্যে রয়েছে—
শীর্ষ ৯টি সন্ত্রাসী গ্রুপের মূল হোতাদের দ্রুত গ্রেপ্তার।
মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের উৎস চিহ্নিত করে বন্ধ করা।
অপরাধীদের রাজনৈতিক বা অন্য কোনো প্রভাব থাকলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া।
গোয়েন্দা নজরদারি ও কমিউনিটি পুলিশিং আরও শক্তিশালী করা।
খুলনায় সাম্প্রতিক অভিযানে গ্রেপ্তারের সংখ্যা বাড়লেও অপরাধ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি সফলতা নির্ভর করবে সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া, মাদক ও অস্ত্রের সরবরাহ বন্ধ করা এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগের ওপর। সংশ্লিষ্টদের মতে, অপরাধের মূল পরিকল্পনাকারীদের আইনের আওতায় আনা গেলে খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
শাহীন হোসেন, খুলনা থেকে 





















