ঢাকা ০৫:১৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আইডিআরএ চেয়ারম্যানের নতুন চমক: মাত্র ৭ বিমা কোম্পানির কাছেই গ্রাহকদের সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার দাবি বকেয়া

দেশের জীবন বিমা খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিয়ম, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং গ্রাহকদের দাবি পরিশোধে ব্যর্থতার চিত্র আবারও সামনে এসেছে। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)-এর চেয়ারম্যানের সাম্প্রতিক উপস্থাপনায় উঠে এসেছে, মাত্র সাতটি জীবন বিমা কোম্পানির কাছেই গ্রাহকদের দাবি বাবদ প্রায় ৩ হাজার ৫৭১ কোটি ৯০ লাখ টাকা বকেয়া রয়েছে, যা পুরো জীবন বিমা খাতের মোট বকেয়ার প্রায় ৯০ শতাংশ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশের জীবন বিমা শিল্পে দীর্ঘদিন ধরে কিছু প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অনিয়ম, লাইফ ফান্ডের অপব্যবহার এবং দুর্বল তদারকির কারণে হাজার হাজার গ্রাহক মেয়াদপূর্তির পরও তাদের প্রাপ্য অর্থ পাচ্ছেন না। এতে বিমা খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সবচেয়ে সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স। প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে লাইফ ফান্ড থেকে ৪৫৩ কোটি ১৫ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কোম্পানিটির গ্রাহকদের কাছে বকেয়া দাবি প্রায় ২ হাজার ৮১৫ কোটি টাকা, অথচ দাবি নিষ্পত্তির হার মাত্র ১ শতাংশ। ফলে হাজার হাজার পলিসিধারী দীর্ঘদিন ধরে তাদের প্রাপ্য অর্থের অপেক্ষায় রয়েছেন।
দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির লাইফ ফান্ডে পর্যাপ্ত অর্থ নেই; বরং প্রায় ৩০৬ কোটি টাকা অন্য খাতে ব্যয় করা হয়েছে। এতে গ্রাহকদের দাবি পরিশোধে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে।
এছাড়া প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স-এর বিরুদ্ধে গত চার বছরে ১৪০ কোটি ৮৭ লাখ টাকা দাবি বকেয়া থাকার তথ্য উঠে এসেছে।
অন্যদিকে সানফ্লাওয়ার লাইফ ইন্স্যুরেন্স-এর দাবি নিষ্পত্তির হার মাত্র ৬ শতাংশ, আর গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্স-এর দাবি নিষ্পত্তির হার ১৪ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
একই তালিকায় রয়েছে হোমল্যান্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স এবং বায়রা লাইফ/সান লাইফ ইন্স্যুরেন্স। এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দুর্বলতা ও গ্রাহকদের দাবি পরিশোধে ব্যর্থতা জীবন বিমা খাতকে আরও সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংকটের মূল কারণ তিনটি। প্রথমত, লাইফ ফান্ডের অপব্যবহার। অভিযোগ রয়েছে, কিছু প্রতিষ্ঠানের মালিক ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা গ্রাহকদের সঞ্চিত অর্থ বিভিন্ন ব্যক্তিগত বা অ-বিমা খাতে ব্যয় করেছেন। দ্বিতীয়ত, দাবি নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা। বহু গ্রাহক মেয়াদপূর্তির তিন থেকে চার বছর পরও তাদের পাওনা অর্থ হাতে পাননি। তৃতীয়ত, নতুন পলিসি বিক্রি কমে যাওয়া। পুরোনো গ্রাহকদের অভিযোগ ও অর্থ না পাওয়ার কারণে নতুন গ্রাহক বিমা করতে আগ্রহ হারাচ্ছেন, ফলে কোম্পানিগুলোর নগদ প্রবাহও কমে যাচ্ছে।
বিমা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ সংকট নিরসনে কঠোর নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ, লাইফ ফান্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং গ্রাহকদের বকেয়া দাবি দ্রুত পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। অন্যথায় দেশের জীবন বিমা খাতের প্রতি জনআস্থা পুনরুদ্ধার করা কঠিন হয়ে পড়বে।
এদিকে গ্রাহক অধিকারকর্মীরা আইডিআরএ, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সমন্বিত তদন্তের মাধ্যমে অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, গ্রাহকদের কষ্টার্জিত অর্থ সুরক্ষিত রাখা এবং জীবন বিমা খাতকে টেকসই ও স্বচ্ছ করে গড়ে তুলতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

Tag :
About Author Information

Nirvik Sangbad

জনপ্রিয় সংবাদ

আইডিআরএ চেয়ারম্যানের নতুন চমক: মাত্র ৭ বিমা কোম্পানির কাছেই গ্রাহকদের সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার দাবি বকেয়া

আপলোড সময় ০১:৪০:৩৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬

দেশের জীবন বিমা খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিয়ম, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং গ্রাহকদের দাবি পরিশোধে ব্যর্থতার চিত্র আবারও সামনে এসেছে। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)-এর চেয়ারম্যানের সাম্প্রতিক উপস্থাপনায় উঠে এসেছে, মাত্র সাতটি জীবন বিমা কোম্পানির কাছেই গ্রাহকদের দাবি বাবদ প্রায় ৩ হাজার ৫৭১ কোটি ৯০ লাখ টাকা বকেয়া রয়েছে, যা পুরো জীবন বিমা খাতের মোট বকেয়ার প্রায় ৯০ শতাংশ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশের জীবন বিমা শিল্পে দীর্ঘদিন ধরে কিছু প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অনিয়ম, লাইফ ফান্ডের অপব্যবহার এবং দুর্বল তদারকির কারণে হাজার হাজার গ্রাহক মেয়াদপূর্তির পরও তাদের প্রাপ্য অর্থ পাচ্ছেন না। এতে বিমা খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সবচেয়ে সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স। প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে লাইফ ফান্ড থেকে ৪৫৩ কোটি ১৫ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কোম্পানিটির গ্রাহকদের কাছে বকেয়া দাবি প্রায় ২ হাজার ৮১৫ কোটি টাকা, অথচ দাবি নিষ্পত্তির হার মাত্র ১ শতাংশ। ফলে হাজার হাজার পলিসিধারী দীর্ঘদিন ধরে তাদের প্রাপ্য অর্থের অপেক্ষায় রয়েছেন।
দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির লাইফ ফান্ডে পর্যাপ্ত অর্থ নেই; বরং প্রায় ৩০৬ কোটি টাকা অন্য খাতে ব্যয় করা হয়েছে। এতে গ্রাহকদের দাবি পরিশোধে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে।
এছাড়া প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স-এর বিরুদ্ধে গত চার বছরে ১৪০ কোটি ৮৭ লাখ টাকা দাবি বকেয়া থাকার তথ্য উঠে এসেছে।
অন্যদিকে সানফ্লাওয়ার লাইফ ইন্স্যুরেন্স-এর দাবি নিষ্পত্তির হার মাত্র ৬ শতাংশ, আর গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্স-এর দাবি নিষ্পত্তির হার ১৪ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
একই তালিকায় রয়েছে হোমল্যান্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স এবং বায়রা লাইফ/সান লাইফ ইন্স্যুরেন্স। এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দুর্বলতা ও গ্রাহকদের দাবি পরিশোধে ব্যর্থতা জীবন বিমা খাতকে আরও সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংকটের মূল কারণ তিনটি। প্রথমত, লাইফ ফান্ডের অপব্যবহার। অভিযোগ রয়েছে, কিছু প্রতিষ্ঠানের মালিক ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা গ্রাহকদের সঞ্চিত অর্থ বিভিন্ন ব্যক্তিগত বা অ-বিমা খাতে ব্যয় করেছেন। দ্বিতীয়ত, দাবি নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা। বহু গ্রাহক মেয়াদপূর্তির তিন থেকে চার বছর পরও তাদের পাওনা অর্থ হাতে পাননি। তৃতীয়ত, নতুন পলিসি বিক্রি কমে যাওয়া। পুরোনো গ্রাহকদের অভিযোগ ও অর্থ না পাওয়ার কারণে নতুন গ্রাহক বিমা করতে আগ্রহ হারাচ্ছেন, ফলে কোম্পানিগুলোর নগদ প্রবাহও কমে যাচ্ছে।
বিমা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ সংকট নিরসনে কঠোর নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ, লাইফ ফান্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং গ্রাহকদের বকেয়া দাবি দ্রুত পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। অন্যথায় দেশের জীবন বিমা খাতের প্রতি জনআস্থা পুনরুদ্ধার করা কঠিন হয়ে পড়বে।
এদিকে গ্রাহক অধিকারকর্মীরা আইডিআরএ, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সমন্বিত তদন্তের মাধ্যমে অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, গ্রাহকদের কষ্টার্জিত অর্থ সুরক্ষিত রাখা এবং জীবন বিমা খাতকে টেকসই ও স্বচ্ছ করে গড়ে তুলতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।