দেশজুড়ে স্বাস্থ্য খাতে অনিয়ম, দুর্নীতি ও সেবাবাণিজ্যের অভিযোগ নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়কে ঘিরে একাধিক অভিযোগ সামনে আসায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। স্থানীয় সূত্র, ভুক্তভোগী রোগী, স্বাস্থ্যকর্মী ও বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে—স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন স্তরে চলছে পদ্ধতিগত অনিয়ম, যা জনসেবাকে বাধাগ্রস্ত করে তুলছে।
বিশেষ করে কেনাকাটা ও টেন্ডার প্রক্রিয়া, নিয়োগ-বদলি বাণিজ্য, মেডিকেল বিল জালিয়াতি, সরকারি সম্পদের অপব্যবহার এবং চিকিৎসা সেবায় অবহেলার মতো অভিযোগগুলো সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। এতে করে সাধারণ মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে আস্থা হারাচ্ছেন।
কেনাকাটা ও টেন্ডার: অতিমূল্যে ক্রয় ও পছন্দের ঠিকাদার
স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে বড় অনিয়মের অভিযোগগুলোর একটি হলো কেনাকাটা ও টেন্ডার প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য দপ্তরে যন্ত্রপাতি, ওষুধ, আসবাবপত্র ক্রয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা মানা হয় না।
অনুসন্ধানে জানা গেছে:
দরপত্র আহ্বান না করে সরাসরি পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দেওয়া হয়
একই পণ্য বাজারমূল্যের তুলনায় ২ থেকে ৩ গুণ বেশি দামে কেনা দেখানো হয়
নিম্নমানের যন্ত্রপাতি সরবরাহ করেও পূর্ণ বিল গ্রহণ করা হয়
একজন স্বাস্থ্যকর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “একই যন্ত্র বাজারে ৫০ হাজার টাকায় পাওয়া গেলেও কাগজে দেখানো হয় দেড় লাখ টাকা। এর মধ্যে বড় অঙ্কের অর্থ ভাগাভাগি হয়।”
নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্য: টাকার বিনিময়ে পদায়ন
স্বাস্থ্য বিভাগের নিয়োগ ও বদলি প্রক্রিয়ায়ও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে আউটসোর্সিং কর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, ওয়ার্ডবয় নিয়োগে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ ব্যাপক।
অভিযোগের ধরন:
চাকরি পেতে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিতে হয়
পছন্দের এলাকায় পোস্টিং পেতে ঘুষ লাগে
বদলি ঠেকাতে বা দ্রুত বদলি পেতে লেনদেন হয়
একজন নার্স অভিযোগ করেন, “দূরবর্তী এলাকায় পোস্টিং এড়াতে অনেককে টাকা দিতে হয়। আবার শহরে থাকতে চাইলে আলাদা ‘ম্যানেজ’ করতে হয়।”
এমএসআর বিল জালিয়াতি: ভুয়া ভাউচারে অর্থ আত্মসাৎ
হাসপাতালের মেডিকেল সার্জিক্যাল রিকুইজিট (MSR) বিলেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী:
ভুয়া ভাউচার তৈরি করে বিল উত্তোলন করা হয়
বাস্তবে সরবরাহ না হওয়া পণ্যের জন্যও অর্থ নেওয়া হয়
একই পণ্য একাধিকবার দেখিয়ে বিল করা হয়
এতে করে সরকারি অর্থের অপচয় হচ্ছে এবং প্রকৃত প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম রোগীদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না।
সরকারি যানবাহন ও জ্বালানি খাতে অনিয়ম
স্বাস্থ্য বিভাগের অ্যাম্বুলেন্স ও অন্যান্য সরকারি গাড়ির ব্যবহারে অনিয়মের অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
অভিযোগ:
অ্যাম্বুলেন্সের জ্বালানি চুরি
মেরামতের নামে অতিরিক্ত বিল দেখানো
ব্যক্তিগত কাজে সরকারি গাড়ি ব্যবহার
স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক সময় জরুরি রোগী অ্যাম্বুলেন্স না পেয়ে ভোগান্তিতে পড়লেও গাড়িগুলো অন্য কাজে ব্যবহৃত হয়।
কোভিড-১৯ খাতে লুটপাটের অভিযোগ
দেশব্যাপী কোভিড-১৯ মহামারির সময় স্বাস্থ্য খাতে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। দুদকের অনুসন্ধানে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রীসহ একাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা সুপারিশ করা হয়েছে।
অভিযোগের মধ্যে রয়েছে:
টিভিসি প্রচার না করেও লাখ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো
মোবাইল অ্যাপ উন্নয়নের নামে কোটি টাকা আত্মসাৎ
জরুরি সরঞ্জাম ক্রয়ে অতিমূল্য দেখানো
বিশেষজ্ঞদের মতে, মহামারির মতো সংকটকেও কিছু অসাধু ব্যক্তি “ব্যবসার সুযোগ” হিসেবে ব্যবহার করেছে।
সেবাবাণিজ্য: চিকিৎসা খাতে মানবিকতার সংকট
খুলনা অঞ্চলের অনেক সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা সেবায় অবহেলার অভিযোগ রয়েছে। রোগীদের অভিযোগ, সরকারি হাসপাতালে সঠিক চিকিৎসা পেতে হলে “অতিরিক্ত খরচ” করতে হয়।
রোগীদের অভিজ্ঞতা:
ডাক্তারের সাক্ষাৎ পেতে ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়
পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য বাইরে নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠানো হয়
ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে বাধ্য করা হয়
একজন রোগীর স্বজন বলেন, “সরকারি হাসপাতালে গেলেও শেষ পর্যন্ত সবকিছু বাইরে থেকে করতে হয়। এতে খরচ কমার বদলে বাড়ে।”
ডাক্তারদের বিরুদ্ধে অভিযোগ: প্রাইভেট চেম্বারমুখী প্রবণতা
সরকারি হাসপাতালের কিছু চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে—তারা সরকারি হাসপাতালে যথাযথ সময় দেন না এবং রোগীদের নিজেদের প্রাইভেট চেম্বারে যেতে উৎসাহিত করেন।
অভিযোগের চিত্র:
সরকারি হাসপাতালে রোগীকে সংক্ষিপ্ত সময় দেওয়া
বিস্তারিত চিকিৎসার জন্য প্রাইভেট চেম্বারে যেতে বলা
নির্দিষ্ট ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রেফার করা
এতে করে দরিদ্র রোগীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ও হতাশা
স্বাস্থ্য খাতের এই অনিয়মের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। তাদের মতে, স্বাস্থ্যসেবা একটি মৌলিক অধিকার হলেও বাস্তবে তা “বাণিজ্যে” পরিণত হয়েছে।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “অসুস্থ হলে আমরা সবচেয়ে অসহায় হয়ে পড়ি। তখনই বেশি শোষণের শিকার হতে হয়।”
জবাবদিহিতার অভাব
সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে উঠে এসেছে জবাবদিহিতার অভাব। অভিযোগ উঠলেও অনেক ক্ষেত্রে তদন্ত হয় না বা হলেও তার ফলাফল প্রকাশ পায় না।
বিশেষজ্ঞদের মতে:
অভ্যন্তরীণ নজরদারি দুর্বল
শাস্তির উদাহরণ কম
রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অনেক অভিযোগ চাপা পড়ে যায়
বিশেষজ্ঞদের মতামত
স্বাস্থ্যনীতি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই সমস্যা কাঠামোগত এবং দীর্ঘদিনের।
তাদের মতে:
স্বাস্থ্য খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়াতে হবে
ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে
দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে
করণীয়: কীভাবে পরিস্থিতি উন্নত করা সম্ভব
বিশেষজ্ঞদের প্রস্তাব অনুযায়ী কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:
১. ই-প্রোকিউরমেন্ট চালু করা
সব কেনাকাটা অনলাইনে এনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
২. নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করা
মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে এবং তদারকি বাড়াতে হবে।
৩. ডিজিটাল বিলিং ব্যবস্থা
এমএসআর বিলসহ সব আর্থিক লেনদেন ডিজিটাল করতে হবে।
৪. অভিযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন
রোগীদের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
৫. কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা
দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
উপসংহার
খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়সহ স্বাস্থ্য খাতে যে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠছে, তা শুধু একটি প্রশাসনিক সমস্যা নয়—এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি। স্বাস্থ্যসেবা যেখানে মানুষের মৌলিক অধিকার, সেখানে এই ধরনের অনিয়ম গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
সচেতন মহলের দাবি—স্বাস্থ্য খাতকে দুর্নীতিমুক্ত করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় এই সংকট আরও গভীর হবে এবং এর চরম মূল্য দিতে হবে সাধারণ মানুষকেই।
সংবাদ শিরোনাম ::
কেনাকাটা, নিয়োগ, সেবা ও চিকিৎসায় দুর্নীতির ছায়া
খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়সহ স্বাস্থ্য খাতে অনিয়মের বিস্তৃত অভিযোগ
-
মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন, খুলনা বুরো - আপডেট সময় ০২:১৭:২৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৬ মে ২০২৬
- ৪৬ বার পড়া হয়েছে
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

























