ঢাকা ০৭:৫০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
আনন্দবাজার পত্রিকায় শিরোনামঃ রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের ইস্তফায় ‘জলঘোলা’ হচ্ছে বাংলাদেশে তালার খলিলনগর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান প্রনব ঘোষ স্বপদে বহাল সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য বিশেষ নির্দেশনা লাইসেন্স ফিরে পেল আদ্‌-দ্বীন হাসপাতাল খুলনায় রেলস্টেশনের সামনে গুলিবিদ্ধ যুবকের লাশ উদ্ধার সাংবাদিক সুরুজ আলীর মামলা প্রত্যাহার ও নিঃশর্ত মুক্তির দাবি রাজশাহী প্রেসক্লাবের খুলনায় ৯ সন্ত্রাসী গ্রুপের দৌরাত্ম্য: ১৫ দিনে গ্রেপ্তার ১৮৪, তবু অধরা শীর্ষ গডফাদাররা রাজশাহী ‘ম্যাঙ্গো লাভার’ ই-কমার্স কার্যালয়ে তরুণীকে ধর্ষণচেষ্টার মামলায় যুবক আটক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রাজশাহী প্রেসক্লাব সভাপতি সাইদুর রহমানের সুস্থতা কামনায় দোয়া মাহফিল খুলনায় বাসের টিকিট কালেক্টরের অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার
সরকারি প্রতিষ্ঠান নাকি ব্যক্তিগত দোকানঘর?

ময়মনসিংহ বন বিভাগে অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য ও ক্ষমতার অপব্যবহারের ভয়াবহ অভিযোগ

অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য ও ক্ষমতার অপব্যবহারের এক ভয়ংকর চিত্র উঠে এসেছে ময়মনসিংহ বন বিভাগে। সাধারণ সেবাগ্রহীতা, লট ক্রেতা, ঠিকাদার থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ—পুরো বিভাগ যেন একটি অঘোষিত সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে। আর সেই সিন্ডিকেটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ১৪তম গ্রেডের এক উচ্চমান সহকারী, ইব্রাহিম খান।

অভিযোগ রয়েছে, প্রায় দুই বছর আগে বিভাগে যোগদান করা এই কর্মচারী স্থানীয় প্রভাব খাটিয়ে ধীরে ধীরে বিভাগীয় অফিসের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও আর্থিক কার্যক্রমের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়ে নিয়েছেন। বিস্ময়কর বিষয় হলো—বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মুহাম্মদ কাজী নূরুল করিম ও সহকারী বন সংরক্ষক সাদেকুল ইসলাম খান তার কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কার্যত নীরব ভূমিকা পালন করছেন। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, তারা কি অসহায় নাকি এই অনিয়মের নীরব সহযোগী?

ফাইল নড়াতে লাগছে ঘুষ

অনুসন্ধানে জানা যায়, সংস্থাপন, রাজস্ব, করাতকল ও ডিপো লাইসেন্সসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ শাখার দায়িত্ব পালন করছেন এই উচ্চমান সহকারী। এমনকি ফরেস্টার, ডেপুটি রেঞ্জার ও ফরেস্ট রেঞ্জারদের ফাইলও তার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এ,সি,আর প্রসেসিং, প্রশাসনিক অনুমোদন কিংবা সাধারণ অফিস কার্যক্রম—সবকিছুতেই অঘোষিত অর্থ লেনদেন চলছে। টাকা না দিলে ফাইল আটকে রাখা, হয়রানি করা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগও রয়েছে।

মাঠ পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বিভাগীয় অফিসে যেতে ভয় লাগে। গেলেই টাকা চাওয়া হয়। টাকা না দিলে খারাপ ব্যবহার করা হয়, এমনকি এ,সি,আর নিয়ে ভয় দেখানো হয়।”

নিলাম ও সি,এস এ অনিয়মের অভিযোগ

সরকারি নিলাম প্রক্রিয়াতেও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, নিলামের সি,এস এ কাটাছেঁড়া ও ঘষামাজার মাধ্যমে অবৈধ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে নির্দিষ্ট মহলকে। কয়েকজন লট ক্রেতা দাবি করেন, পূর্ববর্তী নিলামের নথিপত্র তদন্ত করলেই অনিয়মের বাস্তব চিত্র বেরিয়ে আসবে।

এছাড়া বিডি রিলিজ, উপকারভোগীদের লভ্যাংশ বিতরণ ও বিভিন্ন আর্থিক নথি অনুমোদনের ক্ষেত্রেও ঘুষ ছাড়া কোনো ফাইল এগোয় না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

লাইসেন্স বাণিজ্যের অভিযোগ

করাতকল ও ডিপো লাইসেন্স ইস্যু এবং নবায়ন নিয়েও উঠেছে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিটি নতুন লাইসেন্স ইস্যুতে ১৫ হাজার টাকা এবং নবায়নে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। এতে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ সেবাগ্রহীতারা।

টি,পি ও সি,ও ইস্যুতে অর্থ আদায়ের অভিযোগ

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, বিভাগীয় পর্যায় থেকে টি,পি ও সি,ও ইস্যুকেও কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে অর্থ আদায়ের নতুন কৌশল। অভিযোগ রয়েছে, প্রত্যেক টি,পি বাবদ ৪ হাজার টাকা এবং প্রত্যেক সি,ও বাবদ ২ হাজার টাকা আদায়ের জন্য রেঞ্জ ও এসএফএনটিসি পর্যায়ে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এমনকি “টিম্বার ফরম” নামে মাসিক রিপোর্ট জমা দিতেও টাকা দাবি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

বদলি বাণিজ্যে আতঙ্ক

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে বদলি বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে। অভিযোগ রয়েছে, নিজেকে “ছায়া বিভাগীয় বন কর্মকর্তা” পরিচয় দিয়ে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলির ভয় দেখিয়ে নিয়মিত মাসোহারা আদায় করা হচ্ছে। বদলি কমিটির সদস্য না হয়েও বাগানমালী থেকে ফরেস্ট রেঞ্জার পর্যন্ত বদলির নিয়ন্ত্রণ তার হাতে—এমন অভিযোগ করেছেন একাধিক কর্মকর্তা।

অভিযোগকারীদের দাবি, এই বদলি বাণিজ্য ও দুর্নীতির মাধ্যমে ইতোমধ্যে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন এই উচ্চমান সহকারী।

ইটভাটা ব্যবসা নিয়েও প্রশ্ন

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, বিভাগীয় অফিসের প্রভাব খাটিয়ে নিজ এলাকায় ইটভাটা ব্যবসা গড়ে তুলেছেন তিনি। ওই ইটভাটা নিয়ে মামলা ও জেল খাটার জনশ্রুতি থাকলেও বিভাগীয়ভাবে তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

নীরব ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা

এতসব গুরুতর অভিযোগের পরও বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ও সহকারী বন সংরক্ষকের রহস্যজনক নীরবতা জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সচেতন মহলের দাবি, দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

 

Tag :
About Author Information

Nirvik Sangbad

জনপ্রিয় সংবাদ

আনন্দবাজার পত্রিকায় শিরোনামঃ রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের ইস্তফায় ‘জলঘোলা’ হচ্ছে বাংলাদেশে

সরকারি প্রতিষ্ঠান নাকি ব্যক্তিগত দোকানঘর?

ময়মনসিংহ বন বিভাগে অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য ও ক্ষমতার অপব্যবহারের ভয়াবহ অভিযোগ

আপলোড সময় ১১:৩৯:৫২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২২ মে ২০২৬

অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য ও ক্ষমতার অপব্যবহারের এক ভয়ংকর চিত্র উঠে এসেছে ময়মনসিংহ বন বিভাগে। সাধারণ সেবাগ্রহীতা, লট ক্রেতা, ঠিকাদার থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ—পুরো বিভাগ যেন একটি অঘোষিত সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে। আর সেই সিন্ডিকেটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ১৪তম গ্রেডের এক উচ্চমান সহকারী, ইব্রাহিম খান।

অভিযোগ রয়েছে, প্রায় দুই বছর আগে বিভাগে যোগদান করা এই কর্মচারী স্থানীয় প্রভাব খাটিয়ে ধীরে ধীরে বিভাগীয় অফিসের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও আর্থিক কার্যক্রমের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়ে নিয়েছেন। বিস্ময়কর বিষয় হলো—বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মুহাম্মদ কাজী নূরুল করিম ও সহকারী বন সংরক্ষক সাদেকুল ইসলাম খান তার কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কার্যত নীরব ভূমিকা পালন করছেন। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, তারা কি অসহায় নাকি এই অনিয়মের নীরব সহযোগী?

ফাইল নড়াতে লাগছে ঘুষ

অনুসন্ধানে জানা যায়, সংস্থাপন, রাজস্ব, করাতকল ও ডিপো লাইসেন্সসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ শাখার দায়িত্ব পালন করছেন এই উচ্চমান সহকারী। এমনকি ফরেস্টার, ডেপুটি রেঞ্জার ও ফরেস্ট রেঞ্জারদের ফাইলও তার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এ,সি,আর প্রসেসিং, প্রশাসনিক অনুমোদন কিংবা সাধারণ অফিস কার্যক্রম—সবকিছুতেই অঘোষিত অর্থ লেনদেন চলছে। টাকা না দিলে ফাইল আটকে রাখা, হয়রানি করা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগও রয়েছে।

মাঠ পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বিভাগীয় অফিসে যেতে ভয় লাগে। গেলেই টাকা চাওয়া হয়। টাকা না দিলে খারাপ ব্যবহার করা হয়, এমনকি এ,সি,আর নিয়ে ভয় দেখানো হয়।”

নিলাম ও সি,এস এ অনিয়মের অভিযোগ

সরকারি নিলাম প্রক্রিয়াতেও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, নিলামের সি,এস এ কাটাছেঁড়া ও ঘষামাজার মাধ্যমে অবৈধ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে নির্দিষ্ট মহলকে। কয়েকজন লট ক্রেতা দাবি করেন, পূর্ববর্তী নিলামের নথিপত্র তদন্ত করলেই অনিয়মের বাস্তব চিত্র বেরিয়ে আসবে।

এছাড়া বিডি রিলিজ, উপকারভোগীদের লভ্যাংশ বিতরণ ও বিভিন্ন আর্থিক নথি অনুমোদনের ক্ষেত্রেও ঘুষ ছাড়া কোনো ফাইল এগোয় না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

লাইসেন্স বাণিজ্যের অভিযোগ

করাতকল ও ডিপো লাইসেন্স ইস্যু এবং নবায়ন নিয়েও উঠেছে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিটি নতুন লাইসেন্স ইস্যুতে ১৫ হাজার টাকা এবং নবায়নে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। এতে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ সেবাগ্রহীতারা।

টি,পি ও সি,ও ইস্যুতে অর্থ আদায়ের অভিযোগ

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, বিভাগীয় পর্যায় থেকে টি,পি ও সি,ও ইস্যুকেও কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে অর্থ আদায়ের নতুন কৌশল। অভিযোগ রয়েছে, প্রত্যেক টি,পি বাবদ ৪ হাজার টাকা এবং প্রত্যেক সি,ও বাবদ ২ হাজার টাকা আদায়ের জন্য রেঞ্জ ও এসএফএনটিসি পর্যায়ে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এমনকি “টিম্বার ফরম” নামে মাসিক রিপোর্ট জমা দিতেও টাকা দাবি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

বদলি বাণিজ্যে আতঙ্ক

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে বদলি বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে। অভিযোগ রয়েছে, নিজেকে “ছায়া বিভাগীয় বন কর্মকর্তা” পরিচয় দিয়ে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলির ভয় দেখিয়ে নিয়মিত মাসোহারা আদায় করা হচ্ছে। বদলি কমিটির সদস্য না হয়েও বাগানমালী থেকে ফরেস্ট রেঞ্জার পর্যন্ত বদলির নিয়ন্ত্রণ তার হাতে—এমন অভিযোগ করেছেন একাধিক কর্মকর্তা।

অভিযোগকারীদের দাবি, এই বদলি বাণিজ্য ও দুর্নীতির মাধ্যমে ইতোমধ্যে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন এই উচ্চমান সহকারী।

ইটভাটা ব্যবসা নিয়েও প্রশ্ন

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, বিভাগীয় অফিসের প্রভাব খাটিয়ে নিজ এলাকায় ইটভাটা ব্যবসা গড়ে তুলেছেন তিনি। ওই ইটভাটা নিয়ে মামলা ও জেল খাটার জনশ্রুতি থাকলেও বিভাগীয়ভাবে তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

নীরব ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা

এতসব গুরুতর অভিযোগের পরও বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ও সহকারী বন সংরক্ষকের রহস্যজনক নীরবতা জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সচেতন মহলের দাবি, দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।