ঢাকার সাভারে চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী জান্নাত ওরফে শালমী মণ্ডলের অস্বাভাবিক মৃত্যুকে ঘিরে নানা প্রশ্ন ও রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। মাত্র ৯ বছর বয়সী এই শিশুর মৃত্যু আত্মহত্যা, নাকি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তার বাবা রিপন মণ্ডল। তিনি দাবি করেছেন, তার মেয়েকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। একই সঙ্গে মৃত্যুর আগে শিশুটির সঙ্গে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছিল কি না, সেটিও তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
গত ১৮ আগস্ট ২০২৬ তারিখে শালমী মণ্ডলের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে বলে জানা গেছে। পরিবারের পক্ষ থেকে প্রাথমিকভাবে দাবি করা হয়, তাকে ঘরের ফ্যানের সঙ্গে একটি ওড়না দিয়ে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। তবে ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করেছেন—এমন কোনো ব্যক্তির কথা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পরে শিশুটির মা মৌসুমি আক্তার তাকে নিচে নামিয়ে রাখেন বলে জানা গেছে।
মায়ের পেশা ও পারিবারিক সম্পর্ক নিয়ে তথ্য
শালমীর মা মৌসুমি আক্তার সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সিনিয়র নার্স হিসেবে কর্মরত বলে পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে। একই সূত্রের দাবি অনুযায়ী, মৌসুমি আক্তার এ পর্যন্ত তিনটি বিবাহ করেছেন। তার প্রথম বিবাহের পর দ্বিতীয় স্বামী ছিলেন রিপন মণ্ডল এবং পরবর্তীতে তৃতীয় স্বামী হিসেবে ডা. আশরাফুল ইসলাম আরিফের সঙ্গে তার বিবাহ হয়।
রিপন মণ্ডল খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী এবং মৌসুমি আক্তার মুসলিম ধর্মাবলম্বী বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। রিপন মণ্ডল ও মৌসুমি আক্তারের দাম্পত্য জীবনের প্রায় তিন বছর আগে বিবাহবিচ্ছেদ হয়। বর্তমানে মৌসুমি আক্তারের স্বামী হিসেবে ডা. আশরাফুল ইসলাম আরিফের নাম পরিবারের পক্ষ থেকে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে মৌসুমি আক্তারের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সম্পর্কের এসব তথ্যের সঙ্গে শালমীর মৃত্যুর কোনো সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা এখনো তদন্তে প্রমাণিত হয়নি।
ঘটনার দিন সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একজন ম্যাট্রন ফোন করে রিপন মণ্ডলকে তার মেয়ের মৃত্যুর খবর দেন। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন রিপন মণ্ডল। সেখানে গিয়ে তিনি দেখতে পান, তার মেয়ের মরদেহ নামিয়ে নেওয়া হয়েছে। তিনি মরদেহ নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি আটকানোর চেষ্টা করেন এবং পুলিশকে খবর দেন।
পরে পুলিশের একজন সাব-ইন্সপেক্টর ঘটনাস্থলে এসে একটি ওড়না ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। তবে ততক্ষণে মরদেহ নিচে নামানো হয়ে গিয়েছিল।
শিশুটির বাবা রিপন মণ্ডলের দাবি, তার মেয়ের মৃত্যুর বিষয়টি স্বাভাবিক নয়। তিনি বলেন, শালমীর ঘাড় অস্বাভাবিকভাবে নরম বা ঢিলে মনে হয়েছে। এ কারণে তার সন্দেহ, শিশুটির ওপর শারীরিক নির্যাতন করা হয়ে থাকতে পারে। এমনকি মৃত্যুর আগে তার সঙ্গে কোনো যৌন নির্যাতন বা অন্য কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছিল কি না, সেটিও তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
তবে এসব অভিযোগ এখনো প্রমাণিত নয়। শালমীর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে পোস্টমর্টেম রিপোর্টের অপেক্ষায় রয়েছে পুলিশ। তদন্ত ও চিকিৎসা পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতেই মৃত্যুটি আত্মহত্যা, দুর্ঘটনা নাকি হত্যাকাণ্ড—তা নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হবে।
এদিকে শালমীর মা মৌসুমি আক্তার দাবি করেছেন, ঘটনার দিন মেয়ের সঙ্গে তার কোনো ঝগড়া, বিবাদ বা গালাগালির ঘটনা ঘটেনি। তিনি জানান, তিনি একটি প্রশিক্ষণে ছিলেন এবং মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সিসি ক্যামেরা দেখে মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগও করেছিলেন। এরপর হঠাৎ কী ঘটেছে, তা তিনি জানেন না। তার দাবি, শালমী একটি হিজাবের ওড়না ব্যবহার করে আত্মহত্যা করেছে।
তবে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ওই বাড়িতে সিসি ক্যামেরা থাকলেও ঘটনার দিনের ফুটেজ এখনো প্রকাশ করা হয়নি। এ বিষয়ে মৌসুমি আক্তারের কাছে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে তিনি ফুটেজ তার কাছে রয়েছে এবং সময়মতো তা প্রকাশ করবেন বলে জানান। ফলে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তদন্তের স্বার্থে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ফুটেজটি সংগ্রহ করে পরীক্ষা করলে ঘটনার প্রকৃত সময় ও পরিস্থিতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
শালমীর পরিবার সূত্রে জানা গেছে, শালমী ও তার আরেক বোন যমজ। অপর বোন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এবং ঢাকায় থেকে পড়াশোনা করে। শালমী তার মা ও পরিবারের সঙ্গে থাকত।
শিশুটির বাবার অভিযোগ, তার মেয়ে মাত্র ৯ বছরের। এত অল্প বয়সে সে আত্মহত্যার বিষয়টি কতটা বুঝত—এ নিয়েও তিনি প্রশ্ন তুলেছেন। তার দাবি, মৃত্যুর ঘটনাটি গভীরভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন এবং কোনো ধরনের অপরাধ হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
ঘটনায় শিশুটির মা মৌসুমি আক্তার এবং তার বর্তমান স্বামী ডা. আশরাফুল ইসলামকে নিয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে সন্দেহের কথা বলা হয়েছে। তবে তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এখনো তদন্তে প্রমাণিত নয়। কাউকে দোষী সাব্যস্ত করার আগে পুলিশি তদন্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণ, সিসি ক্যামেরার ফুটেজ এবং পোস্টমর্টেম রিপোর্টের ফলাফল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এ বিষয়ে সাভার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, পুলিশ পোস্টমর্টেম রিপোর্টের অপেক্ষায় রয়েছে। রিপোর্ট পাওয়ার পর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে সেটিও আইন অনুযায়ী গ্রহণ করা হবে বলে জানান তিনি।
এদিকে শালমী মণ্ডলের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় এলাকাবাসীর মধ্যেও নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। শিশুটির মৃত্যু কীভাবে হলো, মৃত্যুর আগে তার সঙ্গে কী ঘটেছিল, সিসি ক্যামেরার ফুটেজে কী রয়েছে এবং ঘটনাটি আত্মহত্যা নাকি অন্য কোনো কারণে মৃত্যু—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অমীমাংসিত।
শালমীর বাবা রিপন মণ্ডলের দাবি, তার মেয়ের মৃত্যুর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। তিনি দ্রুত পোস্টমর্টেম রিপোর্ট প্রকাশ, সিসি ক্যামেরার ফুটেজ পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় ফরেনসিক তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের দাবি জানান।
একটি শিশুর অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন হয়রানির শিকার না হন এবং কোনো অপরাধী যেন আইনের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যেতে না পারে—এমন একটি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তই এখন সবার প্রত্যাশা। শালমীর মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করে দোষী প্রমাণিত ব্যক্তিদের আইন অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তার বাবা রিপন মণ্ডল।
দিলশান আরা অনিমা সাভার থেকে 














