দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে গরিব-অসহায় মানুষের শেষ ভরসা সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির চাল। খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি, ভিজিএফ, ওএমএস, জিআর – এই চালগুলো পেটে ভাত তুলে দেয় লাখো মানুষের। কিন্তু খুলনা আঞ্চলিক খাদ্য অধিদপ্তরের আওতাধীন বিভিন্ন গুদাম ও ডিলার পয়েন্টে ওজনে কারসাজি, বরাদ্দে অনিয়ম ও কাগুজে বিতরণের অভিযোগে সরকারি চাল যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে। ভুক্তভোগীরা পাচ্ছেন ৩০ কেজির জায়গায় ২৫ কেজি, কার্ড থাকা সত্ত্বেও মাসের পর মাস চাল পাচ্ছেন না।
নির্ভীক সংবাদ এর অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে খুলনার খালিশপুর, দাকোপ, কয়রা, পাইকগাছা ও বটিয়াঘাটার একাধিক গুদাম ওএমএস ডিলারের বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়মের তথ্য। ১২ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে খুলনা আঞ্চলিক খাদ্য অধিদপ্তরের নিজস্ব অফিস আদেশেও “বস্তার ওজনে কম খাদ্যশস্য বিতরণ” নিয়ে সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে। তারপরও কেন অনিয়ম থামছে না – সেই প্রশ্নই এখন সবার মুখে।
*ওজনে কারসাজি: ৩০ কেজির বস্তায় ২৫ কেজি*
খুলনা সদরের খালিশপুর এলাকার ওএমএস ডিলার পয়েন্টে সরেজমিনে দেখা যায়, সরকারি ৩০ কেজি চালের বস্তা ওজন মেশিনে দিলে কাঁটায় উঠছে ২৫ থেকে ২৭ কেজি। অর্থাৎ প্রতি বস্তায় ৩-৫ কেজি চাল কম। দৈনিক যদি ৫০০ বস্তা বিক্রি হয়, তাহলে ডিলার অতিরিক্ত পাচ্ছেন ১৫০০ থেকে ২৫০০ কেজি চাল। মাসে এই অংক দাঁড়ায় ৪৫ থেকে ৭৫ মেট্রিক টন। বাজার দরে যার মূল্য ২০ লাখ থেকে ৩৩ লাখ টাকা।
ওএমএস সুবিধাভোগী রিকশাচালক মফিজুল ইসলাম বলেন, “কার্ডে লেখা ৩০ কেজি, ১৫ টাকা কেজি। কিন্তু বস্তা কাঁধে নিলেই বোঝা যায় ওজন কম। প্রতিবাদ করলে ডিলার বলে, ‘সরকারই কম দেয়, আমার কি করার আছে। নিলে নেন, না নিলে যান।’ গরিব মানুষ, ঝগড়া করার শক্তি নাই।”
খুলনা আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকের ১২ এপ্রিল ২০২৬ এর অফিস আদেশ নং-১৩.০১.৪৭৩১.০০১.২২.০২৬.২৫- এ স্পষ্ট বলা হয়েছে, “গুদাম ও ডিলার পয়েন্টে বস্তার ওজন যাচাই করে বিতরণ নিশ্চিত করতে হবে। ওজনে কম পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” কিন্তু বাস্তবে সেই আদেশ কাগজেই বন্দি।
*ভিজিএফ/খাদ্যবান্ধব চাল: তালিকায় ভূত, গুদামে লুট*
দাকোপ ও কয়রা উপকূলের মানুষের জন্য বরাদ্দ ভিজিএফ ও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাল নিয়েও চলছে ব্যাপক অনিয়ম। ইউনিয়ন পরিষদের তালিকায় মৃত, প্রবাসী ও স্বচ্ছল ব্যক্তির নাম থাকলেও প্রকৃত গরিব বাদ পড়ছেন।
কয়রা উপজেলার বাগালী ইউনিয়নের বিধবা সালেহা বেগম অভিযোগ করেন, “আমার কার্ড আছে, কিন্তু ৩ মাস ধরে চাল পাই না। চেয়ারম্যানের লোক বলে, ‘চাল আসে নাই।’ অথচ বাজারে দেখি একই চাল ৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। কার্ডের চাল যায় কই?”
শেরপুরে ২০ জুন ৩৩ হাজার কেজি সরকারি চাল জব্দের ঘটনার পর খুলনার খাদ্য অধিদপ্তর নড়েচড়ে বসলেও দাকোপ-কয়রার গুদামে এখনও তদারকি নেই। ইউপি সদস্যদের অভিযোগ, বরাদ্দ আসার আগেই ডিলার-মেম্বার-চেয়ারম্যানের ত্রিমুখী ভাগাভাগি হয়ে যায়।
*ওএমএস ডিলার নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও জামানত জালিয়াতি*
খুলনা মহানগরীর ওএমএস ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ আছে, যোগ্য ও অস্বচ্ছল আবেদনকারী বাদ দিয়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় ডিলারশিপ দেওয়া হচ্ছে। জামানতের টাকা ব্যাংক ড্রাফটের পরিবর্তে হাতে-হাতে লেনদেনের অভিযোগও আছে।
একজন বাদ পড়া আবেদনকারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমার সব কাগজ ঠিক ছিল, ব্যাংক সলভেন্সিও ছিল। কিন্তু ডিলারশিপ পেল এলাকার প্রভাবশালীর ভাতিজা। শুনেছি টেবিলের নিচ দিয়ে লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে। গরিবের চাল নিয়ে ব্যবসা।”
*গুদামে মজুত ঘাটতি ও কাগুজে বিতরণ*
খুলনা সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন সিঅ্যান্ডবি ঘাট গুদামে মজুত যাচাইয়ে দেখা যায়, রেজিস্টারে দেখানো মজুতের চেয়ে বাস্তবে চাল কম আছে প্রায় 200 মেট্রিক টন। কর্মকর্তাদের ব্যাখ্যা, “পরিবহনজনিত ক্ষতি ওজনে ঘাটতি।” কিন্তু পরিবহন ঠিকাদার বলছেন, “আমরা ফুল ওজনেই মাল ডেলিভারি দেই। গুদামে ঢোকার পর হিসাবের গড়বড়।”
আরও ভয়াবহ অভিযোগ, “কাগুজে বিতরণ”। অর্থাৎ রেজিস্টারে স্বাক্ষর নিয়ে চাল দেখানো হয়, কিন্তু বাস্তবে চাল দেওয়া হয় না। পরে সেই চাল বাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়। পাইকগাছার একজন ইউপি সদস্য বলেন, “মেম্বার-চেয়ারম্যান মিলে গরিবের স্বাক্ষর জাল করে চাল তুলে নেয়। গরিব মানুষ স্বাক্ষর করতেও পারে না, চালও পায় না।”
*খাদ্য অধিদপ্তরের ব্যাখ্যা ও প্রতিশ্রুতি*
এ বিষয়ে খুলনা আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক দৈনিক স্বাধীন মতকে বলেন, “ওজনে কম বিতরণের অভিযোগ আমরা গুরুত্বের সাথে নিয়েছি। ১২ এপ্রিলের অফিস আদেশের পর মনিটরিং টিম বাড়ানো হয়েছে। যে সকল ডিলার ও গুদাম কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রমাণ পাওয়া যাবে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা ও মামলা করা হবে। খুলনার সব গুদামে ডিজিটাল ওজন মেশিন ও সিসিটিভি বসানোর প্রক্রিয়া চলছে।”
তিনি আরও বলেন, “ভিজিএফ তালিকা হালনাগাদের কাজ চলছে। মৃত ও অযোগ্য ব্যক্তির নাম বাদ দিয়ে প্রকৃত গরিবকে তালিকাভুক্ত করা হবে। যেকোনো অনিয়মের তথ্য পেলে ১৬১৬৩ নম্বরে অভিযোগ জানানোর আহ্বান জানাচ্ছি।”
*বিশেষজ্ঞ মতামত: স্বচ্ছতাই একমাত্র পথ*
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো: আব্দুল্লাহ বলেন, “খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচির সফলতা নির্ভর করে শেষ মাইল ডেলিভারির স্বচ্ছতার উপর। ওজন কারসাজি, কাগুজে বিতরণ ও তালিকায় কারসাজি – এই তিনটি বন্ধ করতে পারলেই 80% অনিয়ম কমে যাবে।”
তিনি ৪ টি সুপারিশ করেন:
1. প্রতিটি বস্তায় কিউআর কোড ওজন লিখে সিলগালা করে দেওয়া
2. ডিলার পয়েন্টে ক্রেতার মোবাইলে এসএমএস কনফার্মেশন
3. মাসে একবার গণশুনানি করে ভুক্তভোগীর অভিযোগ নিষ্পত্তি
4. অনিয়মকারীর লাইসেন্স বাতিল ও কালো তালিকাভুক্ত করা
*ভুক্তভোগীর ৭ দফা দাবি*
খুলনার ওএমএস ও ভিজিএফ সুবিধাভোগীদের পক্ষ থেকে দাবি:
১. প্রতিটি ডিলার পয়েন্টে ডিজিটাল ওজন মেশিন ও বড় পর্দায় ওজন প্রদর্শন
২. বস্তার গায়ে ওজন ও মূল্য লিখে স্টিকার লাগানো
৩. তালিকা থেকে মৃত ও স্বচ্ছল ব্যক্তির নাম বাদ দিয়ে প্রকৃত গরিবকে অন্তর্ভুক্ত করা
৪. ডিলার নিয়োগে 100% স্বচ্ছতা ও মেধার ভিত্তিতে নির্বাচন
৫. গুদামে সিসিটিভি ও রেজিস্টার অনলাইনে প্রকাশ
৬. মাসে একবার ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা
৭. অভিযোগের জন্য টোল-ফ্রি হটলাইন ও দ্রুত প্রতিকার
আগামী ১৫ দিন সাংবাদিকদের মনিটরিং টিম খুলনার ১৫ টি ডিলার পয়েন্ট ও ৫ টি গুদামে সরেজমিন যাবে। দেখা হবে, ওজন বাড়ছে কিনা, ভূতের নাম বাদ পড়ছে কিনা। প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হলে পরের রিপোর্ট হবে “খাদ্য অধিদপ্তরের আদেশ: কাগজে শক্ত, বাস্তবে দুর্বল – খুলনার গুদামে ওজন কারসাজি চলছেই”।
সরকারের সদিচ্ছা, প্রশাসনের কঠোরতা আর জনগণের সচেতনতা – এই ত্রয়ীর সমন্বয়ই পারে খুলনার খাদ্য গুদামগুলোকে দুর্নীতিমুক্ত করতে। গরিবের চাল গরিবের পেটেই যাক – এটাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
খুলনা অফিস 
























