পটুয়াখালীর সংরক্ষিত বনাঞ্চলকে ঘিরে অবৈধ দখল, অর্থের বিনিময়ে বনসম্পদ ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া, খাল দখল, অবৈধ মাছ শিকার এবং বনভূমি ধ্বংসের একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে। স্থানীয় বাসিন্দা, পরিবেশ সচেতন মহল এবং বন সংরক্ষণে সংশ্লিষ্টদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী চক্র বনাঞ্চলকে অবৈধ বাণিজ্যের নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করছে। ফলে একদিকে যেমন সংরক্ষিত বনভূমি সংকুচিত হচ্ছে, অন্যদিকে হুমকির মুখে পড়ছে এলাকার জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বনাঞ্চলের অভ্যন্তরে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে অবৈধভাবে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, মহিষ চরানো, গবাদিপশু প্রবেশ, জেলেদের মাছ ধরার অনুমতি এবং খালে বাঁধ দেওয়ার মতো কর্মকাণ্ডের বিপরীতে নির্ধারিত হারে অর্থ নেওয়া হয়। স্থানীয়দের দাবি, এসব অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা না হয়ে অসাধু ব্যক্তিদের মাধ্যমে আদায় করা হচ্ছে। যদিও এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক অভিযোগ হলো প্রায় ২৯৫ একর সংরক্ষিত বনভূমি দখল ও লুটপাট। অভিযোগকারীদের দাবি, বনভূমির বিভিন্ন অংশে অবৈধভাবে দখল করে স্থাপনা নির্মাণ, গাছ কেটে জমি দখল এবং বনভূমির শ্রেণি পরিবর্তনের চেষ্টা চলছে। এতে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের আয়তন কমে যাচ্ছে এবং বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এছাড়া বনাঞ্চলের ভেতরের খালগুলোতে বাঁধ দিয়ে পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে স্বাভাবিক জলপ্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং জলজ পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। একই সঙ্গে নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার করে নির্বিচারে মাছ শিকার করায় দেশীয় মাছের প্রজনন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় জেলেরা ও পরিবেশকর্মীরা।
পরিবেশবিদদের মতে, সংরক্ষিত বনাঞ্চলে এ ধরনের অনিয়ম অব্যাহত থাকলে উপকূলীয় পরিবেশ, বনজ সম্পদ এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তারা বনাঞ্চলে নিয়মিত নজরদারি, অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ, বন অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে বন সংরক্ষণের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বন রক্ষার দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নজরদারির ঘাটতি এবং প্রভাবশালী মহলের প্রভাবের কারণে অনেক অভিযোগই তদন্তের পর্যায়ে পৌঁছায় না। তাদের দাবি, বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, জেলা প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সমন্বিতভাবে কাজ করে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। একই সঙ্গে বনভূমি দখল, অবৈধ অর্থ আদায় এবং পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ডে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বন বিভাগের কর্মকর্তাদের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে অভিযোগের বিষয়ে তাদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া গেলে তা গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পটুয়াখালীর সংরক্ষিত বনাঞ্চল শুধু বনজ সম্পদের উৎস নয়, এটি উপকূলীয় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং বনভূমি রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
শাহিন হোসেন 























