ঢাকা ০৪:১৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
আনন্দবাজার পত্রিকায় শিরোনামঃ রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের ইস্তফায় ‘জলঘোলা’ হচ্ছে বাংলাদেশে তালার খলিলনগর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান প্রনব ঘোষ স্বপদে বহাল সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য বিশেষ নির্দেশনা লাইসেন্স ফিরে পেল আদ্‌-দ্বীন হাসপাতাল খুলনায় রেলস্টেশনের সামনে গুলিবিদ্ধ যুবকের লাশ উদ্ধার সাংবাদিক সুরুজ আলীর মামলা প্রত্যাহার ও নিঃশর্ত মুক্তির দাবি রাজশাহী প্রেসক্লাবের খুলনায় ৯ সন্ত্রাসী গ্রুপের দৌরাত্ম্য: ১৫ দিনে গ্রেপ্তার ১৮৪, তবু অধরা শীর্ষ গডফাদাররা রাজশাহী ‘ম্যাঙ্গো লাভার’ ই-কমার্স কার্যালয়ে তরুণীকে ধর্ষণচেষ্টার মামলায় যুবক আটক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রাজশাহী প্রেসক্লাব সভাপতি সাইদুর রহমানের সুস্থতা কামনায় দোয়া মাহফিল খুলনায় বাসের টিকিট কালেক্টরের অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার
বিএনপির চাপ, না কি হাসিনার ‘গোপন পরামর্শ’?

আনন্দবাজার পত্রিকায় শিরোনামঃ রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের ইস্তফায় ‘জলঘোলা’ হচ্ছে বাংলাদেশে

বাংলাদেশে নাটকীয় রাজনৈতিক পটপরিবর্তন। মেয়াদ শেষের আগেই ইস্তফা দিলেন রাষ্ট্রপতি মহম্মদ সাহাবুদ্দিন। মুখে অসুস্থতার কারণ বললেও তাঁর পদত্যাগ নিয়ে শুরু হয়েছে জল্পনা।

বছরশেষের আগেই দেশে ফেরার কথা ঘোষণা করেছেন বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ভারতে বসে তাঁর করা সেই মন্তব্যের কয়েক দিনের মাথাতেই ঢাকার রাজনীতিতে নাটকীয় পটপরিবর্তন। পদত্যাগ করলেন সেখানকার রাষ্ট্রপতি মহম্মদ সাহাবুদ্দিন। অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে ইস্তফাপত্র জমা করেন তিনি।

২৪ জুলাই পদত্যাগের পর গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন সাহাবুদ্দিন। বলেন, ‘‘এখন বিষয়টা সকলেই জেনে গিয়েছেন। ফলে আমার থেকে নতুন করে শোনার কিছু নেই। হ্যাঁ, আমি অসুস্থ, তাই পদত্যাগ করেছি।’’ ২০২৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ওই পদে থাকার কথা ছিল তাঁর। অর্থাৎ মেয়াদ শেষের প্রায় দু’বছর আগেই পদ ছাড়লেন তিনি। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, সাময়িক ভাবে অধ্যক্ষই সামলাবেন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব।

১৯৪৯ সালের ডিসেম্বরে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের পাবনায় জন্ম সাহাবুদ্দিনের। পাবনার রাধানগর মজুমদার অ্যাকাডেমি স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের পড়ুয়া ছিলেন সাহাবুদ্দিন। গত শতাব্দীর ৭০-র দশকে রাজশাহি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনোবিজ্ঞানের ডিগ্রি লাভ করেন তিনি। এ ছাড়া আইনের শংসাপত্রও রয়েছে তাঁর।

কলেজে থাকাকালীন ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাবনায় স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হন তিনি। ওই বছর এপ্রিলে ভারতে এসে সামরিক প্রশিক্ষণ নেন সাহাবুদ্দিন। এর পর ফিরে গিয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে নামেন গেরিলা সংঘর্ষে। ডিসেম্বরে ‘বঙ্গবন্ধু’ শেখ মুজিবরের হাত ধরে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হলে গুরুত্ব বৃদ্ধি পায় তাঁর।

শেখ মুজিবের দল আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠনের নাম হল ছাত্র লীগ। বাংলাদেশের জন্মের পর পাবনায় তার সভাপতি হন সাহাবুদ্দিন। ১৯৭৪ সালে দলের যুব সংগঠনের দায়িত্ব পান তিনি। ১৯৭৫ সালে সেনা অভ্যুত্থানের জেরে ঢাকার ধানমন্ডির বাসভবনে সপরিবার খুন হন শেখ মুজিব। বাড়ির প্রায় সবাইকেই গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেয় বিদ্রোহী গোষ্ঠী। ওই ঘটনার কয়েক দিনের মাথায় গ্রেফতার হন সাহাবুদ্দিন।

মুজিব হত্যাকাণ্ডের পর বেশ কিছু দিন জেলে ছিলেন বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি। মুক্তি পাওয়ার পর ১৯৮০ সালে যোগ দেন ‘দৈনিক বাংলার বাণী’তে। সেখানে বছর দুই সাংবাদিকতা করার পর ১৯৮২ সালে বাংলাদেশের বিচার বিভাগে পা পড়ে তাঁর। গোড়ায় সহকারী বিচারক হিসাবে শুরু হয় নতুন কর্মজীবন। পরবর্তী কালে জেলা ও দায়রা বিচারকের দায়িত্বও পালন করতে দেখা গিয়েছে তাঁকে। ২০০৬ সালে অবসর নেন সাহাবুদ্দিন।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে মুজিবের আওয়ামী লীগের গুরুত্ব অপরিসীম। সংশ্লিষ্ট দলটির জাতীয় কাউন্সিলের ভোটে নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব পালন করেছেন সাহাবুদ্দিন। একটা সময় প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী হাসিনার রাজনৈতিক পরামর্শদাতা ছিলেন তিনি। বিশেষজ্ঞদের দাবি, সেই কারণেই ২০২৩ সালে অত্যন্ত আস্থাভাজন সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি করেন হাসিনা। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতাতেই দেশের সর্বোচ্চ পদে বসেন তিনি।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসাবে সবচেয়ে কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে সাহাবুদ্দিনকে চলতে হয়েছে বললে অত্যুক্তি হবে না। ২০২৪ সালের নির্বাচনে জিতে পঞ্চম বারের জন্য প্রধানমন্ত্রী হন হাসিনা। কিন্তু, ওই বছরের এপ্রিলেই ছাত্র-যুবর গণঅভ্যুত্থানের জেরে পতন হয় তাঁর। ফলে ঢাকা ছেড়ে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিতে হয় তাঁকে। ওই সময় তিনি সাহাবুদ্দিনের কাছেই পদত্যাগপত্র জমা করেন বলে জানিয়েছিল একাধিক গণমাধ্যম।

হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হতেই বাংলাদেশে গঠিত হয় অন্তর্বর্তিকালীন সরকার। এর প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস। রাষ্ট্রপতিপদে অবশ্য বহাল ছিলেন সাহাবুদ্দিন। সরকার পরিচালনা নিয়ে বার বার ইউনূসের কড়া সমালোচনা করতে দেখা যায় তাঁকে। দু’বছরের মাথায় জাতীয় নির্বাচনের আয়োজন করে অন্তর্বর্তী প্রশাসন। তাতে বিপুল আসনে জিতে প্রধানমন্ত্রী হন বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টির (বিএনপি) তারেক রহমান।

এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে শপথ নেয় বাংলাদেশের নতুন সরকার। তার কয়েক দিনের মাথায় ‘কালের কণ্ঠ’ নামের একটি গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিস্ফোরক অভিযোগ করেন সাহাবুদ্দিন। বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার থাকাকালীন অসাংবিধানিক ভাবে তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করার ষড়যন্ত্র করা হয়। এ ব্যাপারে ইউনূস এবং গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্বে থাকা ছাত্রনেতাদের দিকে আঙুল তোলেন তিনি।

কালের কণ্ঠ’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সাহাবুদ্দিন জানান, অন্তর্বর্তী সরকার চলাকালীন প্রধান উপদেষ্টা ইউনূসের সঙ্গে কার্যত তাঁর কোনও যোগাযোগ ছিল না। তাঁকে রাজনৈতিক ভাবেও কোণঠাসা করা হচ্ছিল। অগস্ট গণআন্দোলনের ছাত্রনেতারা তাঁর পদত্যাগের দাবিতে সরব ছিলেন। যদিও ক্ষমতায় এসে প্রকাশ্যে তাঁকে সরানোর কথা তারেকের বিএনপিকে বলতে শোনা যায়নি। তবে পর্দার আড়ালে থেকে তাঁর উপর চাপ তৈরি করা হচ্ছিল বলে জানিয়েছে বিবিসি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দাবি, দু’টি কারণে পদ ছাড়লেন সাহাবুদ্দিন। প্রথমত, বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে বিএনপি। ফলে মতাদর্শগত কারণে আওয়ামী লীগপন্থী সাহাবুদ্দিনের বিরোধ প্রকাশ্যে আসতে পারে। পদত্যাগের মধ্যে দিয়ে সেটা এড়ালেন বছর ৭৭-র এই বর্ষীয়ান রাজনৈতিক নেতা।

দ্বিতীয়ত, হাসিনা দেশে ফিরলে ফের উত্তাল হতে পারে বাংলাদেশের রাজনীতি। জুলাই আন্দোলনে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত। ঘরে ফিরে আদালতের কাছে আত্মসমর্পণের কথা রয়েছে তাঁর। অন্য দিকে এখনও বাংলাদেশে নিষিদ্ধ হাসিনার দল আওয়ামী লীগ। অনেকের মতে সেই রাজনৈতিক জটিলতাও এড়াতে চাইলেন সাহাবুদ্দিন।

সম্প্রতি বাংলাদেশের গণমাধ্যমে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফোনালাপের একটি খবর ছড়িয়ে পড়ে। তার সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি। তবে বলা হচ্ছে, চিকিৎসার প্রয়োজনে কিছু দিন আগে সাহাবুদ্দিন লন্ডনে থাকাকালীন হাসিনার সঙ্গে তাঁর ফোনে কথা হয়েছে। তার পরেই দেশ জুড়ে তাঁর পদত্যাগের জল্পনা জোরালো হয়।

গত ১৯ জুলাই চিকিৎসার জন্য তাইল্যান্ডে যান বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন। ২৬ জুলাই দেশে ফেরার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু সফর কাটছাঁট করে ২৪ তারিখ ঢাকায় ফেরেন তিনি। তর পরই ইস্তফা দেন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন।

বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ কোনও কারণে শূন্য হলে ৯০ দিনের মধ্যে করতে হয় নির্বাচন। ফলে সেই প্রস্তুতি যে শুরু হয়ে গিয়েছে, তা বলাই বাহুল্য। বর্তমানে পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকার জন্য বিএনপির মনোনীত প্রার্থীর রাষ্ট্রপতি হওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল।

সুত্র আনন্দবাজার

Tag :
About Author Information

Nirvik Sangbad

জনপ্রিয় সংবাদ

আনন্দবাজার পত্রিকায় শিরোনামঃ রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের ইস্তফায় ‘জলঘোলা’ হচ্ছে বাংলাদেশে

বিএনপির চাপ, না কি হাসিনার ‘গোপন পরামর্শ’?

আনন্দবাজার পত্রিকায় শিরোনামঃ রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের ইস্তফায় ‘জলঘোলা’ হচ্ছে বাংলাদেশে

আপলোড সময় ০৪:০৫:০৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬

বাংলাদেশে নাটকীয় রাজনৈতিক পটপরিবর্তন। মেয়াদ শেষের আগেই ইস্তফা দিলেন রাষ্ট্রপতি মহম্মদ সাহাবুদ্দিন। মুখে অসুস্থতার কারণ বললেও তাঁর পদত্যাগ নিয়ে শুরু হয়েছে জল্পনা।

বছরশেষের আগেই দেশে ফেরার কথা ঘোষণা করেছেন বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ভারতে বসে তাঁর করা সেই মন্তব্যের কয়েক দিনের মাথাতেই ঢাকার রাজনীতিতে নাটকীয় পটপরিবর্তন। পদত্যাগ করলেন সেখানকার রাষ্ট্রপতি মহম্মদ সাহাবুদ্দিন। অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে ইস্তফাপত্র জমা করেন তিনি।

২৪ জুলাই পদত্যাগের পর গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন সাহাবুদ্দিন। বলেন, ‘‘এখন বিষয়টা সকলেই জেনে গিয়েছেন। ফলে আমার থেকে নতুন করে শোনার কিছু নেই। হ্যাঁ, আমি অসুস্থ, তাই পদত্যাগ করেছি।’’ ২০২৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ওই পদে থাকার কথা ছিল তাঁর। অর্থাৎ মেয়াদ শেষের প্রায় দু’বছর আগেই পদ ছাড়লেন তিনি। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, সাময়িক ভাবে অধ্যক্ষই সামলাবেন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব।

১৯৪৯ সালের ডিসেম্বরে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের পাবনায় জন্ম সাহাবুদ্দিনের। পাবনার রাধানগর মজুমদার অ্যাকাডেমি স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের পড়ুয়া ছিলেন সাহাবুদ্দিন। গত শতাব্দীর ৭০-র দশকে রাজশাহি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনোবিজ্ঞানের ডিগ্রি লাভ করেন তিনি। এ ছাড়া আইনের শংসাপত্রও রয়েছে তাঁর।

কলেজে থাকাকালীন ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাবনায় স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হন তিনি। ওই বছর এপ্রিলে ভারতে এসে সামরিক প্রশিক্ষণ নেন সাহাবুদ্দিন। এর পর ফিরে গিয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে নামেন গেরিলা সংঘর্ষে। ডিসেম্বরে ‘বঙ্গবন্ধু’ শেখ মুজিবরের হাত ধরে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হলে গুরুত্ব বৃদ্ধি পায় তাঁর।

শেখ মুজিবের দল আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠনের নাম হল ছাত্র লীগ। বাংলাদেশের জন্মের পর পাবনায় তার সভাপতি হন সাহাবুদ্দিন। ১৯৭৪ সালে দলের যুব সংগঠনের দায়িত্ব পান তিনি। ১৯৭৫ সালে সেনা অভ্যুত্থানের জেরে ঢাকার ধানমন্ডির বাসভবনে সপরিবার খুন হন শেখ মুজিব। বাড়ির প্রায় সবাইকেই গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেয় বিদ্রোহী গোষ্ঠী। ওই ঘটনার কয়েক দিনের মাথায় গ্রেফতার হন সাহাবুদ্দিন।

মুজিব হত্যাকাণ্ডের পর বেশ কিছু দিন জেলে ছিলেন বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি। মুক্তি পাওয়ার পর ১৯৮০ সালে যোগ দেন ‘দৈনিক বাংলার বাণী’তে। সেখানে বছর দুই সাংবাদিকতা করার পর ১৯৮২ সালে বাংলাদেশের বিচার বিভাগে পা পড়ে তাঁর। গোড়ায় সহকারী বিচারক হিসাবে শুরু হয় নতুন কর্মজীবন। পরবর্তী কালে জেলা ও দায়রা বিচারকের দায়িত্বও পালন করতে দেখা গিয়েছে তাঁকে। ২০০৬ সালে অবসর নেন সাহাবুদ্দিন।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে মুজিবের আওয়ামী লীগের গুরুত্ব অপরিসীম। সংশ্লিষ্ট দলটির জাতীয় কাউন্সিলের ভোটে নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব পালন করেছেন সাহাবুদ্দিন। একটা সময় প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী হাসিনার রাজনৈতিক পরামর্শদাতা ছিলেন তিনি। বিশেষজ্ঞদের দাবি, সেই কারণেই ২০২৩ সালে অত্যন্ত আস্থাভাজন সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি করেন হাসিনা। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতাতেই দেশের সর্বোচ্চ পদে বসেন তিনি।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসাবে সবচেয়ে কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে সাহাবুদ্দিনকে চলতে হয়েছে বললে অত্যুক্তি হবে না। ২০২৪ সালের নির্বাচনে জিতে পঞ্চম বারের জন্য প্রধানমন্ত্রী হন হাসিনা। কিন্তু, ওই বছরের এপ্রিলেই ছাত্র-যুবর গণঅভ্যুত্থানের জেরে পতন হয় তাঁর। ফলে ঢাকা ছেড়ে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিতে হয় তাঁকে। ওই সময় তিনি সাহাবুদ্দিনের কাছেই পদত্যাগপত্র জমা করেন বলে জানিয়েছিল একাধিক গণমাধ্যম।

হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হতেই বাংলাদেশে গঠিত হয় অন্তর্বর্তিকালীন সরকার। এর প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস। রাষ্ট্রপতিপদে অবশ্য বহাল ছিলেন সাহাবুদ্দিন। সরকার পরিচালনা নিয়ে বার বার ইউনূসের কড়া সমালোচনা করতে দেখা যায় তাঁকে। দু’বছরের মাথায় জাতীয় নির্বাচনের আয়োজন করে অন্তর্বর্তী প্রশাসন। তাতে বিপুল আসনে জিতে প্রধানমন্ত্রী হন বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টির (বিএনপি) তারেক রহমান।

এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে শপথ নেয় বাংলাদেশের নতুন সরকার। তার কয়েক দিনের মাথায় ‘কালের কণ্ঠ’ নামের একটি গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিস্ফোরক অভিযোগ করেন সাহাবুদ্দিন। বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার থাকাকালীন অসাংবিধানিক ভাবে তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করার ষড়যন্ত্র করা হয়। এ ব্যাপারে ইউনূস এবং গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্বে থাকা ছাত্রনেতাদের দিকে আঙুল তোলেন তিনি।

কালের কণ্ঠ’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সাহাবুদ্দিন জানান, অন্তর্বর্তী সরকার চলাকালীন প্রধান উপদেষ্টা ইউনূসের সঙ্গে কার্যত তাঁর কোনও যোগাযোগ ছিল না। তাঁকে রাজনৈতিক ভাবেও কোণঠাসা করা হচ্ছিল। অগস্ট গণআন্দোলনের ছাত্রনেতারা তাঁর পদত্যাগের দাবিতে সরব ছিলেন। যদিও ক্ষমতায় এসে প্রকাশ্যে তাঁকে সরানোর কথা তারেকের বিএনপিকে বলতে শোনা যায়নি। তবে পর্দার আড়ালে থেকে তাঁর উপর চাপ তৈরি করা হচ্ছিল বলে জানিয়েছে বিবিসি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দাবি, দু’টি কারণে পদ ছাড়লেন সাহাবুদ্দিন। প্রথমত, বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে বিএনপি। ফলে মতাদর্শগত কারণে আওয়ামী লীগপন্থী সাহাবুদ্দিনের বিরোধ প্রকাশ্যে আসতে পারে। পদত্যাগের মধ্যে দিয়ে সেটা এড়ালেন বছর ৭৭-র এই বর্ষীয়ান রাজনৈতিক নেতা।

দ্বিতীয়ত, হাসিনা দেশে ফিরলে ফের উত্তাল হতে পারে বাংলাদেশের রাজনীতি। জুলাই আন্দোলনে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত। ঘরে ফিরে আদালতের কাছে আত্মসমর্পণের কথা রয়েছে তাঁর। অন্য দিকে এখনও বাংলাদেশে নিষিদ্ধ হাসিনার দল আওয়ামী লীগ। অনেকের মতে সেই রাজনৈতিক জটিলতাও এড়াতে চাইলেন সাহাবুদ্দিন।

সম্প্রতি বাংলাদেশের গণমাধ্যমে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফোনালাপের একটি খবর ছড়িয়ে পড়ে। তার সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি। তবে বলা হচ্ছে, চিকিৎসার প্রয়োজনে কিছু দিন আগে সাহাবুদ্দিন লন্ডনে থাকাকালীন হাসিনার সঙ্গে তাঁর ফোনে কথা হয়েছে। তার পরেই দেশ জুড়ে তাঁর পদত্যাগের জল্পনা জোরালো হয়।

গত ১৯ জুলাই চিকিৎসার জন্য তাইল্যান্ডে যান বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন। ২৬ জুলাই দেশে ফেরার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু সফর কাটছাঁট করে ২৪ তারিখ ঢাকায় ফেরেন তিনি। তর পরই ইস্তফা দেন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন।

বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ কোনও কারণে শূন্য হলে ৯০ দিনের মধ্যে করতে হয় নির্বাচন। ফলে সেই প্রস্তুতি যে শুরু হয়ে গিয়েছে, তা বলাই বাহুল্য। বর্তমানে পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকার জন্য বিএনপির মনোনীত প্রার্থীর রাষ্ট্রপতি হওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল।

সুত্র আনন্দবাজার