সরকার স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং এর আওতাধীন বিভিন্ন দপ্তর, সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানে গত ১৭ বছরে (২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত) সংঘটিত অনিয়ম, দুর্নীতি ও অপব্যবহার খতিয়ে দেখতে সাত সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুসারে গঠিত এ কমিটিকে ৬০ কর্মদিবসের মধ্যে বিস্তারিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। এই পদক্ষেপকে অনেকে স্থানীয় সরকার খাতে দীর্ঘদিনের জমে থাকা দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি বড় ধরনের সংস্কার উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন।
কমিটির গঠন ও দায়িত্ব
সরকারি সূত্র জানায়, কমিটির প্রধান করা হয়েছে একজন অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র সচিবকে। অন্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রতিনিধি, স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (আরডিএ) এবং জাতীয় স্থানীয় সরকার ইনস্টিটিউটের (এনআইএলজি) প্রতিনিধি। কমিটিতে বহিরাগত বিশেষজ্ঞ ও স্বচ্ছতা আন্দোলনের প্রতিনিধিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।
কমিটিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে:
উক্ত সময়কালে স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতায় বাস্তবায়িত সকল উন্নয়ন প্রকল্প, টেন্ডার, ক্রয়, নিয়োগ, পদোন্নতি ও বরাদ্দ প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখা।
ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশনসহ সকল স্তরের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে ঘটে যাওয়া দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান।
প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি, নিম্নমানের কাজ, ঘুষ-দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক বিবেচনায় অনিয়মের তথ্য সংগ্রহ।
দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা।
মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, “প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় এই কমিটি গঠন করা হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে জনগণের সেবা ও উন্নয়নের নামে যে বিপুল অর্থের অপচয় হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরা হবে।”
১৭ বছরের প্রেক্ষাপট
২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে স্থানীয় সরকার খাতে ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড হয়। এলজিইডি, এলজিআরডি, পল্লী উন্নয়ন বোর্ডসহ বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়। রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট, বাজার নির্মাণ, পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন, ড্রেনেজ ব্যবস্থা ইত্যাদি খাতে বিপুল বিনিয়োগ হয়।
কিন্তু এই সময়কালে দুর্নীতির অভিযোগও ছিল ব্যাপক। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এবং অন্যান্য সংস্থার প্রতিবেদনে বারবার উঠে এসেছে যে, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, টেন্ডারে অনিয়ম, প্রকল্পের মালামাল চুরি, ভুয়া বিল ভাউচার এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দুর্নীতি ছিল নিয়মিত ঘটনা।
উদাহরণস্বরূপ:
এলজিইডির বিভিন্ন প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধির হার অস্বাভাবিক ছিল।
ইউনিয়ন পরিষদের উন্নয়ন বরাদ্দের বড় অংশ জনপ্রতিনিধিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যেত বলে অভিযোগ।
পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশনে ক্রয় প্রক্রিয়ায় সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য।
নিয়োগ ও পদোন্নতিতে মেধা ও যোগ্যতার পরিবর্তে রাজনৈতিক আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়া।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এসব অভিযোগ আরও জোরালো হয়। নতুন সরকারের আমলে স্থানীয় সরকার খাতকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার অংশ হিসেবে এই তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে।
দুর্নীতির সম্ভাব্য ক্ষেত্রসমূহ
কমিটি যেসব বিষয় বিশেষভাবে খতিয়ে দেখবে বলে জানা গেছে:
১. প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম
রাস্তা-ঘাট নির্মাণে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার, প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি করে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় এবং ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশ।
২. টেন্ডার প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি
একই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বারবার কাজ দেওয়া, ভুয়া প্রতিযোগিতা এবং ঘুষের মাধ্যমে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ।
৩. জনবল নিয়োগ ও পদোন্নতি
রাজনৈতিক বিবেচনায় অযোগ্যদের নিয়োগ, যোগ্য প্রার্থীদের বঞ্চিত করা এবং অবৈধভাবে পদোন্নতি।
৪. আর্থিক অনিয়ম
বরাদ্দকৃত অর্থের অপব্যবহার, ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে বিল উত্তোলন এবং অর্থ আত্মসাৎ।
৫. জমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ
প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণে অতিরিক্ত মূল্য নির্ধারণ এবং স্বজনদের সুবিধা প্রদান।
প্রতিক্রিয়া
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, “জনগণের ট্যাক্সের টাকায় যারা দুর্নীতি করেছে, তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। কমিটি নিরপেক্ষভাবে কাজ করবে এবং প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
টিআইবির নির্বাহী পরিচার্য ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “স্থানীয় সরকার খাতে দুর্নীতি দীর্ঘদিন ধরে জনগণের সেবা ব্যাহত করেছে। এই তদন্ত যদি স্বচ্ছ ও কার্যকর হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এ খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে।”
বিরোধী দলের কেউ কেউ অবশ্য এই উদ্যোগকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবে দেখছেন। তবে সাধারণ নাগরিক ও সুশীল সমাজের বড় অংশ এটিকে স্বাগত জানিয়েছেন।
চ্যালেঞ্জ ও প্রত্যাশা
১৭ বছরের বিপুল তথ্য-উপাত্ত খতিয়ে দেখা কমিটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক নথিপত্র নষ্ট হয়ে যাওয়া, সাক্ষীদের অনীহা এবং রাজনৈতিক চাপের আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কমিটিকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। প্রতিবেদন প্রকাশের পর দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে জনগণের আস্থা ফিরবে না।
স্থানীয় সরকার খাত বাংলাদেশের উন্নয়নের মূল ভিত্তি। গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত জনগণের দৈনন্দিন সেবা এখান থেকেই আসে। এ খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।
কমিটির ৬০ দিনের সময়সীমা শেষ হলে জাতি অপেক্ষায় থাকবে একটি বিস্তারিত, সাহসী ও বাস্তবসম্মত প্রতিবেদনের জন্য, যা শুধু অতীতের দুর্নীতি উন্মোচন করবে না, ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম রোধে কার্যকর সুপারিশও দিতে পারবে।
(এই প্রতিবেদনটি সরকারি প্রজ্ঞাপন, মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য, টিআইবি প্রতিবেদন, বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভিত্তিতে তৈরি। বিস্তারিত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর আরও বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে।)
বিস্তারিত বিশ্লেষণ ও পটভূমি (প্রতিবেদনের বিস্তৃত অংশ)
স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোর সবচেয়ে নিচের স্তর। এটি জনগণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ২০০৯ সালের পর আওয়ামী লীগ সরকার এ খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করে। কিন্তু উন্নয়নের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে অভিযোগের পাহাড়।
এলজিইডির একক প্রকল্পেই হাজার কোটি টাকার কাজ হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্প শুরুর আগেই ঠিকাদার নির্ধারিত হয়ে যেত। ফলে প্রতিযোগিতামূলক মূল্য পাওয়া যেত না। গ্রামীণ রাস্তায় নিম্নমানের ইট-পাথর ব্যবহার করে কয়েক মাসের মধ্যে রাস্তা নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঘটনা অসংখ্য।
পৌরসভাগুলোতে ময়লা ব্যবস্থাপনা, পানি সরবরাহ ও ড্রেনেজ প্রকল্পে বড় অঙ্কের দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অনেক মেয়র ও কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে সম্পদের অসংগতির মামলা হয়েছে, যদিও বিচার প্রক্রিয়া ধীরগতির ছিল।
ইউনিয়ন পরিষদে এডিপি বরাদ্দের টাকা থেকে শুরু করে টিসিবি পণ্য বিতরণ পর্যন্ত প্রায় সব ক্ষেত্রেই অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অনেক চেয়ারম্যান নিজের আত্মীয়-স্বজনদের মাধ্যমে কাজ করে টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ।
এই তদন্ত কমিটি যদি সত্যিকার অর্থে স্বাধীনভাবে কাজ করে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তাহলে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় একটি নতুন অধ্যায় শুরু হতে পারে। জনগণ এখন চায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং প্রকৃত উন্নয়ন।
সংবাদ শিরোনাম ::
স্থানীয় সরকার বিভাগে ১৭ বছরের দুর্নীতি খতিয়ে দেখতে ৭ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন
-
:মোঃশাহীন হোসেন, স্টাফ রিপোর্টার খুলনা অফিস - আপডেট সময় ০৭:৪০:৪৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৪ মে ২০২৬
- ১৬ বার পড়া হয়েছে
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ


























