সাংবাদিকতা ও ভয়েস প্রেজেন্টারের আড়ালে ‘হানি ট্র্যাপ’ (প্রেমের ফাঁদ), চাঁদাবাজি, অর্থ আত্মসাৎ ও চাকরি দেওয়ার নামে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে খুলনা জেলার কয়রা উপজেলার এক নারীর বিরুদ্ধে। সুমাইয়া সুলতানা নামের ওই নারীর বিরুদ্ধে স্থানীয় সাংবাদিক ফোরাম থেকে বহিষ্কার, একাধিক মারামারি ও প্রতারণার মামলাসহ নানা অসামাজিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগী ও এলাকাবাসী।অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই চক্রের মূল সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার বাসিন্দা শিহাবুজ্জামান নামের এক যুবক, যিনি নিজেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের ভাগনে পরিচয় দিয়ে বেড়ান। বর্তমানে এই প্রতারক চক্রের খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন খুলনা ও সাতক্ষীরার একাধিক সাধারণ মানুষ।খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খুলনা জেলার কয়রা উপজেলার মহারাজপুর ইউনিয়নের দেয়াড়া গ্রামের তোজাম গাজীর ছোট মেয়ে সুমাইয়া সুলতানা দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে আসছিলেন। বিভিন্ন নিউজ পোর্টালে ভয়েস প্রেজেন্টার হিসেবে কাজ করার সুবাদে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে তিনি এলাকায় চাঁদাবাজি ও অর্থ লুটপাটের সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। এসব শৃঙ্খলাভঙ্গ ও দুর্নীতির অভিযোগে প্রথমে তাকে ‘কয়রা সাংবাদিক ফোরাম’ থেকে বহিষ্কার করা হয়।সম্প্রতি তিনি অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও মাল্টিমিডিয়া ‘দৈনিক সাতক্ষীরা দিগন্ত’ (ডিএসডি টিভি)-তে যুক্ত হলে সেখানেও তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ওঠে। এ বিষয়ে ডিএসডি টিভির সম্পাদক মেহেদী হাসানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে সুমাইয়া সুলতানাকে অফিশিয়ালভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। তবে এই বিষয়ে তিনি মিডিয়ার সামনে বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি।স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সুমাইয়া সুলতানা বিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও সম্প্রতি তার এক বয়োবৃদ্ধ স্বামীকে ডিভোর্স দেন। আর্থিক অবস্থা দেখে ওই ব্যক্তিকে বিয়ে করলেও পরবর্তীতে তার সাথে প্রতারণা করায় স্বামীর দায়ের করা একটি মামলায় নারায়ণগঞ্জ জেলায় সুমাইয়ার বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট রয়েছে।সম্প্রতি সুমাইয়া তার নিজ এলাকায় নিজ বসতঘরে ৫-৭ দিন ধরে এক যুবককে আটকে রাখেন। স্থানীয়দের মনে সন্দেহ জাগলে সুমাইয়া দাবি করেন, তাদের মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে এবং তারা দ্রুত বিয়ে করবেন। শুধু তাই নয়, ওই যুবককে ঝিনাইদহে একটি হাইস্কুলের মাস্টারি চাকরি পাইয়ে দেওয়ার নাম করে স্থানীয় মানুষের কাছ থেকে হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া শুরু হয়।পরবর্তীতে ভুক্তভোগীদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিটের মাধ্যমে ওই যুবকের মোবাইল নম্বর রেজিস্ট্রেশন যাচাই করে জানা যায়, তার আসল নাম শিহাবুজ্জামান। তিনি সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি থানার পশ্চিমপাড়া মাড়িয়াল গ্রামের আবু মুসা মল্লিকের ছেলে। আশাশুনি উপজেলা প্রেস ক্লাবের সাংবাদিকদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, শিহাবুজ্জামান নামের কোনো সাংবাদিক আশাশুনিতে নেই। অথচ তিনি নিজেকে ‘চ্যানেল এ ওয়ান’ এর সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে বেড়াতেন।অনুসন্ধানে আরও বের হয়ে আসে, ‘এস ওয়ান’ এর স্টাফ রিপোর্টার আবু রায়হান নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে ‘বুম’ (মাইক) দেওয়ার কথা বলে ৮ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেছেন এই শিহাব। এছাড়া বিভিন্ন এলাকায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব তার আপন মামা—এমন ভুয়া পরিচয় দিয়ে চাকরি দেওয়ার প্রলোভনে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। এলাকায় তিনি ‘বিশ্ব বাটপার’ হিসেবে পরিচিত।দেয়াড়া গ্রামের বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, সুমাইয়া সুলতানা ও শিহাবের এই ‘হানি ট্র্যাপ’ চক্রের কারণে এলাকার সামাজিক পরিবেশ ধ্বংসের মুখে। বিয়ের লাইসেন্স ছাড়াই সুমাইয়ার বাড়িতে দিন-রাত সংসার করে আসছিলেন শিহাব। স্থানীয়দের অভিযোগ, সুমাইয়ার মা ও পিতা তোজাম গাজী স্বয়ং এই অপকর্মে সহযোগিতা করে আসছেন। উল্লেখ্য, সুমাইয়ার বাবা তোজাম গাজী একজন চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী এবং ইতিপূর্বে খুলনা জেলায় বিপুল পরিমাণ ইয়াবাসহ গ্রেফতার হয়ে তার বিরুদ্ধে মাদক মামলা চলমান রয়েছে।অভিযোগ রয়েছে, সুমাইয়া বিভিন্ন সময় প্রভাবশালীদের নাম ভাঙিয়ে কয়রা থানার পুলিশ প্রশাসনকেও হুমকি-ধমকি ও হয়রানি করে আসছেন। এলাকার সচেতন মহল অবিলম্বে এই চক্রকে গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছেন।এই বিষয়ে কয়রা থানার কয়েকজন কর্মকর্তার সাথে কথা হলে তারা সাংবাদিকদের জানান,”বিষয়টি আমরা অবগত হয়েছি। ভুক্তভোগীদের আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে সঠিক তদন্ত করে এই চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আইন সবাইকে সহায়তা করবে।”এদিকে ঘটনার পর থেকে গণমাধ্যমকর্মী ও স্থানীয়রা অভিযুক্ত সুমাইয়া সুলতানা এবং শিহাবুজ্জামানের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করলে তাদের ব্যবহৃত মোটোফোনের সবকটি নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়। বর্তমানে তারা এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। আশাশুনি ও কয়রা থানাসহ সাতক্ষীরা ও খুলনা জেলা পুলিশকে এই কুখ্যাত প্রতারক চক্রকে দ্রুত গ্রেফতারের জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ।
সংবাদ শিরোনাম ::
সাংবাদিকতার আড়ালে ‘হানি ট্র্যাপ’ ও প্রতারণার জাল কয়রায় সুমাইয়া ও শিহাব চক্রের বিরুদ্ধে ক্ষোভ, গ্রেপ্তারের দাবি
-
মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন, ব্যুরো চীফ, খুলনা - আপডেট সময় ১০:৩৮:২৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬
- ৫ বার পড়া হয়েছে
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ
























