বাংলাদেশের রাজনৈতিক ময়দানে বামপন্থা একসময় ছিল আশার আলো। শ্রমিক-কৃষকের অধিকার, সমতা, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াই—এসব শ্লোগানে উদ্দীপ্ত হয়ে যুবকরা রাস্তায় নামতেন। কিন্তু আজ? আজ সেই বামপন্থা একটি ছোট্ট, ভাঙা আয়নার মতো—যত টুকরো, ততই অস্পষ্ট। বিশ্লেষকরা যেমন বলেন, নেতৃত্বের কোন্দল, লেজুড়বৃত্তি, দ্বৈতনীতি আর নিজেদের আদর্শের সঙ্গে ব্যক্তিগত জীবনের চরম বৈপরীত্য—এসব মিলিয়ে বাম রাজনীতি জনগণের কাছে একটি ‘বিলীয়মান দুর্বল শক্তি’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আসুন, এই বাস্তবতাকে খোলাখুলি বিশ্লেষণ করি।
প্রথমত, অবিরাম বিভাজনের রোগ। বাংলাদেশের বাম দলগুলোর ইতিহাস যেন একটি অবিরাম স্প্লিটিং প্রক্রিয়া। ১৫-২০ জন সক্রিয় নেতা-কর্মী নিয়ে নতুন দল গড়ার ঘটনা হরহামেশাই ঘটে। শুরু হয়েছিল রুশপন্থি ও চীনপন্থি ধারার বিভক্তি দিয়ে। পরে এসেছে নির্বাচনমুখী বনাম নির্বাচনবিরোধী, সংসদীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাসী বনাম সশস্ত্র সংগ্রামের সমর্থক—এমন অসংখ্য খাঁজ। ফলে একই আদর্শের দলগুলো একে অপরের বিরুদ্ধে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’র অভিযোগ তুলে রাস্তায় নামে। সাধারণ মানুষের কাছে বামপন্থার ‘পথ ও লক্ষ্য’ আর অস্পষ্ট হয়ে যায়। কোন দল আসলে কী চায়? সমাজতন্ত্র? নাকি শুধু ক্ষমতার ভাগ? এই প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে জনগণ বামদের দিকে পিঠ ফিরিয়ে নেয়। ফল? একসময়ের শক্তিশালী বাম আন্দোলন আজ মাত্র কয়েক হাজার ভোটের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
দ্বিতীয়ত, লেজুড়বৃত্তির আত্মাহুতি। বামপন্থার মূল দর্শন ছিল স্বাধীন অবস্থান—সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ লড়াই। কিন্তু বাস্তবে? বড় জোটের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ‘ক্ষমতার হালুয়া-রুটি’র পেছনে ছুটেছে অনেকে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট করে মন্ত্রিত্ব নিয়েছেন, আবার সেই জোট ভেঙে গেলে বিএনপির পাশে দাঁড়িয়েছেন। যারা উচ্ছিষ্ট পাননি, তারা বিরোধী শিবিরে গিয়ে ‘নীতির লড়াই’ করার ভান করেছেন। এই লেজুড়বৃত্তি তাদের স্বকীয়তা শেষ করে দিয়েছে। জনগণ দেখেছে—বামরা আসলে কোনো স্বতন্ত্র শক্তি নয়, শুধু ক্ষমতার সিঁড়ি। ফলে তাদের আদর্শিক আবেদন মুছে গেছে।
তৃতীয়ত, প্রতিবেশী আধিপত্যবাদের সামনে নমনীয়তা। ভারতের নানামুখী আগ্রাসন—পানি বণ্টন, সীমান্ত হত্যা, সাংস্কৃতিক হস্তক্ষেপ—এসবের বিরুদ্ধে বাম দলগুলোর প্রতিক্রিয়া কোথায়? প্রায় নীরব। ভারতে সংখ্যালঘু মুসলমানদের ওপর নির্মম নির্যাতনের ঘটনায় কোনো সোচ্চার প্রতিবাদ নেই। অথচ বাংলাদেশে কোনো সংখ্যালঘু সম্প্রদায় আক্রান্ত হলেই বামরা ‘গর্জন’ করে ওঠেন। এই দ্বৈতমানদণ্ড স্পষ্ট। একদিকে ‘আন্তর্জাতিক সংহতি’র কথা বলা, অন্যদিকে নিজের প্রতিবেশীর অপরাধকে চোখ বন্ধ করে উপেক্ষা করা—এটা কি সত্যিকারের বামপন্থা? নাকি রাজনৈতিক সুবিধাবাদ?
চতুর্থত, ইসলামোফোবিয়ার ছায়া। ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর বিরোধিতা করতে গিয়ে অনেক বাম নেতা সরাসরি ইসলামবিদ্বেষী অবস্থান নিয়েছেন। জামায়াত বা অন্যান্য ইসলামী দলের সমালোচনা করা এক জিনিস, কিন্তু সাধারণ মুসলিম জনগণের ধর্মীয় অনুভূতিকে আঘাত করা আরেক জিনিস। ফলে বামপন্থা বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগণের কাছে ‘ধর্মবিরোধী’ হয়ে উঠেছে। একটি দেশে যেখানে ধর্ম জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, সেখানে এই অবস্থান জনবিচ্ছিন্নতা ছাড়া আর কিছু আনে না।
সবশেষে, নেতাদের ব্যক্তিগত জীবনের চরম বৈপরীত্য। মঞ্চে দাঁড়িয়ে ত্যাগ, সংযম ও সমতার বক্তৃতা দেন, কিন্তু বাস্তবে বিলাসী জীবনযাপন, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার। ভিকারুননিসা স্কুলের সভাপতি হয়ে কেউ কেউ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানিয়েছেন। ক্যাসিনো ব্যবসার রক্ষক হয়ে, মন্ত্রিত্বের সুবিধা ভোগ করে নানা কেলেঙ্কারিতে জড়িয়েছেন। এই ‘আদর্শবাদী’ নেতারা যখন ব্যক্তিগত সম্পত্তি বাড়ান, তখন তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা তলানিতে পৌঁছে যায়। জনগণ প্রশ্ন করে—যারা নিজেরাই সমতার নীতি মানেন না, তারা দেশকে সমতার পথে নেবেন কী করে?
উপসংহারে বলা যায়, বাংলাদেশের বামপন্থা আজ নিজেরই শিকার। বিভক্তি, লেজুড়বৃত্তি, দ্বৈতনীতি আর আদর্শের সঙ্গে ব্যক্তিজীবনের ফারাক—এসব মিলিয়ে এটি জনগণের কাছে আর কোনো আবেদন রাখতে পারেনি। একসময়ের বিপ্লবী স্বপ্ন আজ একটি ছোট্ট, অস্পষ্ট ছায়া মাত্র। যদি না বাম নেতারা নিজেদের পুনর্গঠন করেন, স্বকীয়তা ফিরিয়ে আনেন এবং জনগণের সঙ্গে সত্যিকারের সংযোগ গড়েন, তাহলে এই ধারা শুধু ইতিহাসের পাতায়ই থেকে যাবে। বাংলাদেশের মানুষ চায় সমতা, কিন্তু সেই সমতার পথ যদি বিভ্রান্তিকর হয়, তাহলে তারা অন্য পথ খুঁজবে—এটাই স্বাভাবিক। বামপন্থার ভবিষ্যৎ এখন তাদের নিজেদের হাতেই।
লেখক; বিশেষ প্রতিবেদক, নির্ভীক সংবাদ
আব্দুস সামাদ আজাদ বিপু 

























