ইতিহাস তার গতিপথ বারবার পরিবর্তন করে, কিন্তু কিছু তারিখ ইতিহাসের পাতায় কেবল মুদ্রিত থাকে না—রক্তের আখরে, অদম্য সাহসের শক্তিতে খোদাই হয়ে যায়।
২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট ছিল তেমনই এক অগ্নিঝরা ক্ষণ। সুদীর্ঘ ষোলো বছরের চেপে বসা জগদ্দল পাথরকে সরিয়ে বাংলা আবার বিশ্বকে দেখিয়ে দিল—এ মাটি কোনো দিন স্বৈরাচারের দাসত্ব স্বীকার করেনি, কোনো দিন অন্যায়ের কাছে মাথা নোয়ায়নি। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হাত ধরে সূচনা হওয়া জুলাই বিপ্লব আগস্টের ৫ তারিখে এসে এক উত্তাল জনসমুদ্রে, এক মহাবিস্ফোরণে রূপ নিয়েছিল। সেই গণ-অভ্যুত্থানে রচিত হয়েছিল এক দীর্ঘ শোষণের অবসান আর এক নতুন স্বাধীনতার অবিস্মরণীয় গল্প।
আগস্ট মাসকে বাংলা ও বাঙালি দীর্ঘদিন ধরে শোকের মাস হিসেবে জেনে এসেছে। কিন্তু ২০২৪-এর আগস্ট সেই শোককে রূপান্তরিত করেছিল এক দুর্নিবার দ্রোহে। শোকের কালো ছায়া পেরিয়ে রাজপথে ছড়িয়ে পড়েছিল প্রতিরোধের আগুন। জুলাইয়ের তপ্ত দিনগুলোতে যে তাজা রক্তের বন্যা বয়ে গিয়েছিল—রংপুরের বুকে দুই হাত প্রসারিত করে আবু সাঈদের বুক পেতে দেওয়ার সেই মহাকাব্যিক দৃশ্য, কিংবা গুলিবিদ্ধ হওয়ার ক্ষণকাল আগেও স্নিগ্ধ হাসিতে মুগ্ধর সেই আকুল আহ্বান, “পানি লাগবে কারো, পানি?”—সেই আত্মত্যাগ বিফলে যেতে পারে না। বীর শহীদের সেই রক্তই হাজারো যুবকের ধমনিতে ছড়িয়ে দিয়েছিল দ্রোহের আগুন। শোক যখন সংঘবদ্ধ শক্তিতে পরিণত হয়, তখন স্বৈরাচারের লৌহকপাট গুঁড়িয়ে যায়, রাজপ্রাসাদের দেয়াল কেঁপে ওঠে আর অজেয় ভাবা ক্ষমতার ভিত্তি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। ৫ই আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান প্রমাণ করেছে, বন্দুকের নল দিয়ে সাময়িকভাবে ভয় দেখানো যায়, কিন্তু মুক্তির আকাঙ্খায় বুঁদ হওয়া জাগ্রত জনতাকে স্তব্ধ করা যায় না।
এই বিপ্লব কেবল কোনো সাধারণ রাজনৈতিক ক্ষমতার রদবদল ছিল না; এটি ছিল অদম্য তরুণদের আত্মসম্মান ফিরে পাওয়ার লড়াই। এই বিপ্লব ছিল কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, অভিভাবক, রিকশাচালক থেকে শুরু করে সর্বস্তরের মানুষের এক সম্মিলিত হুঙ্কার। কোনো কুটিল রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ নয়, ক্ষমতার লোভ নয়—কেবলমাত্র আত্মমর্যাদা রক্ষা, বাকস্বাধীনতা পুনরুদ্ধার এবং একটি বৈষম্যহীন, ইনসাফভিত্তিক সমাজ গঠনের তীব্র আকুলতাই ছিল এই দ্রোহের প্রধান জ্বালানি। বন্দুকের গুলি, টিয়ারশেল আর কারফিউর ভয় উপেক্ষা করে যখন মায়েরা রাজপথে নেমে এসেছিলেন, যখন কিশোর-তরুণরা বুক চিতিয়ে স্লোগান দিয়েছিল—তখনই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে মুক্তির সূর্য আর বেশি দূরে নয়। দেয়ালজুড়ে আঁকা তরুণদের দ্রোহের গ্রাফিতি আর ‘এক দফা’র একচ্ছত্র দাবি স্তব্ধ করে দিয়েছিল শাসকগোষ্ঠীর মিথ্যা প্রোপাগান্ডা।
৫ই আগস্টের এই ঐতিহাসিক বিজয় শুধু একটি স্বৈরাচারী ব্যবস্থার পতন ঘটায়নি; এটি চিরতরে চুরমার করে দিয়েছে বছরের পর বছর ধরে চেপে বসা ভয়, শঙ্কা আর দাসত্বের সংস্কৃতিকে। তবে এই রক্তক্ষয়ী বিপ্লব আমাদের এক বিশাল দায়িত্বের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। শত শত শহীদের রক্তে ভেজা এবং হাজারো পঙ্গুত্ব বরণ করা বীরের ত্যাগে স্নাত রাজপথ আমাদের প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দেয়—স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে তা রক্ষা করা অনেক বেশি কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং। এই আগুনঝরা বিপ্লব যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন বুনে দিয়েছে, তা হলো এমন এক দেশ—যেখানে বজায় থাকবে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার; যেখানে ক্ষমতার চেয়ে নাগরিকের অধিকার হবে প্রধান।
জুলাইয়ের রক্তাক্ত দ্রোহ আগস্টে এসে যে অভূতপূর্ব বিজয় ছিনিয়ে এনেছে, তার চেতনার মশাল যেন কখনো নিভে না যায়। এই আগুন অন্যায় ও বৈষম্যকে ভস্ম করার আগুন, এই দ্রোহ অধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার দ্রোহ। ইতিহাসের অমলিন পাতায় ৫ই আগস্ট কেবল একটি তারিখ নয়; এটি পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে শোষিত ও নিপীড়িত মানুষের জন্য এক অবিনাশী অনুপ্রেরণার আলোকবর্তিকা। এটি যুগ যুগ ধরে এই বার্তাই জানান দিয়ে যাবে: জবান বন্ধ করা যায়, বুলেট দিয়ে দেহ ঝাঁজরা করা যায়, কিন্তু জাগ্রত জনতাকে কখনো স্তব্ধ করে রাখা যায় না!
লেখক-আব্দুস সামাদ আজাদ বিপু, বিশেষ প্রতিবেদক, নির্ভীক সংবাদ ও নির্বাহী সম্পাদক, অল ইভেন্ট নিউজ এজেন্সি। Bangladesh correspondent, OTV UK
আব্দুস সামাদ আজাদ বিপু 














