বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আওয়ামী লীগ শুধু একটি দলের নাম নয়—এটি বাঙালির রাজনৈতিক সংগ্রাম, স্বাধিকার আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান।
১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক নেতৃত্বে দলটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল, কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম শিক্ষা হলো—একটি দলের অতীতের অবদান তাকে ভবিষ্যতের সব ভুলের লাইসেন্স দেয় না।
আওয়ামী লীগের ইতিহাস তাই একরঙা নয়। এখানে যেমন আছে অসাধারণ রাজনৈতিক অর্জন, তেমনি আছে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, বিরোধী মত দমন, রাজনৈতিক সহিংসতা, দুর্নীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের অন্ধকার অধ্যায়।
আর সেই অন্ধকারের ইতিহাস শুরু করতে হলে শুধু শেখ হাসিনার সময়ের দিকে তাকালে চলবে না; তাকাতে হবে শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলের দিকেও।
স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ ছিল অর্থনৈতিক বিপর্যয়, প্রশাসনিক দুর্বলতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্ভিক্ষ ও নিরাপত্তা সংকটে জর্জরিত। ১৯৭৩ সালের ‘প্রেস এন্ড পাবলিকেশন আইন’ এবং ১৯৭৪ সালের ‘বিশেষ ক্ষমতা আইন’-এর মাধ্যমে সংবাদপত্র ও রাষ্ট্রের বিরোধী কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা সরকারের হাতে আরও বাড়ে। বিশেষ ক্ষমতা আইনের অধীনে নিজস্ব ‘রক্ষী বাহিনী’-নামের দলীয় ক্যাডার দিয়ে সারাদেশে নির্বিচারে অবাধ দমন-পীড়ন-গুম-খুন চালানো হয়।
তারপর আসে ১৯৭৫
২৫ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী সংসদীয় ব্যবস্থা থেকে রাষ্ট্রপতি শাসনব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনে এবং বহুদলীয় রাজনৈতিক কাঠামো সংকুচিত করে। এরপর গঠিত হয় বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ—বাকশাল। বাকশালকে জাতীয় রাজনৈতিক কাঠামোর কেন্দ্রীয় দল হিসেবে প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করা হয়েছিল এবং অন্য রাজনৈতিক সংগঠনগুলোকে এর বাইরে স্বাধীনভাবে থাকার সুযোগ কার্যত সংকুচিত করা হয়।
এর সবচেয়ে প্রতীকী প্রকাশ ঘটেছিল সংবাদপত্রের ক্ষেত্রে।
১৬ জুন ১৯৭৫ অধিকাংশ সংবাদপত্রের প্রকাশনা বন্ধ করে মাত্র চারটি সংবাদপত্র চালু রাখার ব্যবস্থা করা হয়। এই দিনটি পরবর্তীকালে বাংলাদেশের সাংবাদিক সমাজে ‘সংবাদপত্রের কালো দিবস’ হিসেবে স্মরণ করা হয়।
অর্থাৎ যে রাজনৈতিক আন্দোলন স্বাধীনতার জন্য মানুষের কথা বলেছিল, সেই রাজনৈতিক নেতৃত্বের শাসনামলের শেষ পর্যায়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার ইতিহাসও তৈরি হয়েছিল।
এখানে ইতিহাসের প্রতি ন্যায়বিচার করতে একটি কথা অবশ্যই বলতে হয়—
যাঁর নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা অর্জনে ঐতিহাসিক ভূমিকা এবং তাঁর শাসনামলের বিতর্কিত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত—এই তিনটিকে একসঙ্গে অস্বীকার বা একসঙ্গে মহিমান্বিত করা কোনোটিই ইতিহাসচর্চা নয়। ইতিহাস মানে প্রশংসার পাশাপাশি প্রশ্ন করার সাহস।
এরপর পেরিয়ে গেছে প্রায় পাঁচ দশক
শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে আওয়ামী লীগ আবার রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরে আসে। উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও অবকাঠামোগত পরিবর্তনের পাশাপাশি বিরোধী রাজনীতি দমন, নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়া, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের গুরুতর অভিযোগও জমতে থাকে।
শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলন ভয়াবহ রক্তপাতের দিকে যায়। এ ছাত্র আন্দোলন যা ৪ আগস্ট পর্যন্ত দেশজুড়ে ব্যাপক সংঘর্ষে অসংখ্য প্রাণহানী হয়।
৫ আগস্ট ২০২৪ শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে উৎখাত হয়ে দেশ থেকে পালিয়ে যায়।
একটি যুগের অবসান ঘটে
আর এরপরই শুরু হয় ইতিহাসের আরেক অদ্ভুত অধ্যায়।
যে দলের নেতারা একসময় মিছিলের সামনে হাঁটতেন, তাদের অনেকে আত্মগোপনে গেলেন, অনেকে দেশ ছাড়লেন, অনেকে মামলার ভয়ে ঘরবন্দি হলেন। ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে।
কী অদ্ভুত নিয়তি!
একসময় ক্ষমতা ছিল—কিন্তু ভয় ছিল না।
আজ হয়তো টাকা আছে—কিন্তু স্বাধীনতা নেই।
বাড়ি আছে—কিন্তু বাইরে যাওয়ার সাহস নেই।
বিছানা আছে—কিন্তু ঘুম নেই।
ফ্রিজ ভর্তি খাবার আছে—কিন্তু শান্তি নেই।
দামী মোবাইল আছে—কিন্তু ফোন করার মানুষ নেই।
আর সবচেয়ে বড় কথা—
পরিচয় আছে, কিন্তু পরিচয় প্রকাশের নিরাপত্তা নেই।
রাজনীতির সবচেয়ে বড় জোকসটা সম্ভবত এখানেই।
যে রাজনীতি মানুষকে ক্ষমতা দেয়, সেই রাজনীতিই একদিন মানুষকে নিজের পরিচয় লুকাতে বাধ্য করতে পারে।
কিন্তু এখানেই আসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—
কোনো রাজনৈতিক দলের পতন কি তার প্রত্যেক কর্মীর সামাজিক মৃত্যুদণ্ড?
অপরাধ করলে বিচার হবে।
দুর্নীতি করলে মামলা হবে।
খুনের অভিযোগ থাকলে আদালতে বিচার হবে।
গুম, নির্যাতন বা মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ থাকলে তদন্ত হবে, বিচার হবে। কিন্তু একজন সাধারণ কর্মী—যে হয়তো জীবনের অর্ধেক সময় মিছিল করেছে, পোস্টার লাগিয়েছে, সভায় চেয়ার সাজিয়েছে, দলীয় অফিসে চা টেনেছে, নেতার বৌয়ের স্যান্ডল টেনেছে—তার কি সারাজীবন রাজনৈতিক পরিচয়ের জন্য সামাজিক নির্বাসনে থাকতে হবে? রাষ্ট্রের কাজ অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া; পরিচয়কে নয়।
তবে এখানে হয়তো একটা দরজা খুলে যেতে পারে –
আওয়ামী লীগ কি তাবলীগ হয়ে যেতে পারে না?
অবশ্যই ধর্মীয় অর্থে নয়—নিছকই বলছি –
রাজনীতি যদি আপাতত বন্ধ থাকে, তাহলে রাজনীতি বাদ!
সকালবেলা মিছিল নয়—হাঁটাহাঁটি করেন।
বিকেলে সভা নয়—ফুল বাগানে পানি দেন।
সন্ধ্যায় স্লোগান নয়—বই পড়েন।
ফেসবুকে দলীয় পোস্ট নয়—নাতি-নাতনির ছবি দেন।
কর্মী সংগ্রহ নয়—বন্ধু সংগ্রহ করেন।
ক্ষমতা দখলের চিন্তা নয়—নিজের চরিত্র দখল করেন।
অর্থাৎ—
“দল করি” থেকে “দিল ঠিক করি”-তে আসেন!
হয়তো এটাই আওয়ামী লীগের জন্য সবচেয়ে কঠিন রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ হতে পারে। কারণ দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার পর ক্ষমতার বাইরে বসে নিজের দিকে তাকানো খুব কঠিন। ক্ষমতায় থাকলে চারপাশে সবাই বলে—
“নেতা ঠিক বলেছেন।”
ক্ষমতার বাইরে গেলে আয়নাটা বলে—
“নেতা, এবার নিজের মুখটাও একটু দেখেন!”
আর আয়নার এই কথাটাই সবচেয়ে অসহ্য।
আওয়ামী লীগ যদি একদিন আবার রাজনীতিতে ফিরতে চায়, সেটি রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রশ্ন। কিন্তু তার আগে যদি দলটি নিজের ইতিহাসের সামনে দাঁড়ায়, নিজের ভুল স্বীকার করে, অপরাধী ও নিরপরাধের মধ্যে পার্থক্য করে এবং গণতন্ত্র, মতপ্রকাশ ও রাজনৈতিক বহুত্ববাদকে সত্যিকার অর্থে মেনে নেয়—তাহলে সেটি হবে শুধু রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন নয়, একটি আত্মশুদ্ধির প্রত্যাবর্তন।
কারণ স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাস যেমন আওয়ামী লীগের সম্পদ, তেমনি ১৯৭৫-এর বাকশাল ও সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণের ইতিহাসও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের অংশ।
শেখ হাসিনার সময়ের উন্নয়ন যেমন ইতিহাসে থাকবে, তেমনি তার সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা দমন-পীড়ন, নির্বাচন, মানবাধিকার ও দুর্নীতির অভিযোগও ইতিহাসের নথিতে থাকবে।
ইতিহাস কাউকে সম্পূর্ণ দেবতা বানায় না; কাউকে সম্পূর্ণ শয়তানও বানানো উচিত না।
ইতিহাসের কাজ হলো—আলো ও অন্ধকার দুটোই দেখানো।
তাই আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ যদি কখনো নতুন করে লেখা হয়, তাহলে হয়তো সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বাক্যটি হবে—
“আমরা আবার ক্ষমতায় ফিরব”—এর আগে বলেন, “আমরা আগে মানুষ হয়ে ফিরব।”
ক্ষমতায় ফেরার আগে মানুষের কাছে ফিরতে হবে। জনগণের কাছে ক্ষমা চাইতে হলে আগে নিজেদের ভুলের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। আর রাজনৈতিক কর্মীদেরও বুঝতে হবে—দল আপনার পরিচয়ের একটি অংশ হতে পারে; কিন্তু দল আপনার সম্পূর্ণ মানুষটি নয়। রাজনীতি হারালে জীবন হারাতে হয় না। ক্ষমতা হারালে পরিবার হারাতে হয় না। দল নিষিদ্ধ হলে মানবিকতা নিষিদ্ধ হয় না। রাজনৈতিক পরিচয় মুছে গেলেও সামাজিক পরিচয় বেঁচে থাকে।
কেউ শিক্ষক হতে পারে।
কেউ ব্যবসায়ী হতে পারে।
কেউ চাষি হতে পারে।
কেউ সমাজসেবক হতে পারে।
কেউ কবিত হতে পারে।
কেউ নাতির হাত ধরে বাজারে যেতে পারে।
আর কেউ হয়তো চুপচাপ বসে নিজের জীবনের হিসাব করতে পারে—
“আমি এতদিন রাজনীতি করেছি, কিন্তু মানুষ হলাম তো?”
হয়তো সেখান থেকেই শুরু হবে আসল প্রত্যাবর্তন।
তাই বলি—
আওয়ামী লীগ যদি আপাতত “তাবলীগ” হয়ে যায়, ক্ষতি কী?
মসজিদে যাওয়ার আগে অন্তত নিজের বিবেকের দরজায় একবার কড়া নাড়ুক। ক্ষমতায় ফেরার আগে নিজের ভেতরে ফিরুক। জনগণের কাছে যাওয়ার আগে নিজের অতীতের সামনে দাঁড়াক। মিছিলের আগে আয়নার সামনে দাঁড়াক। স্লোগানের আগে আত্মজিজ্ঞাসা করুক।
কারণ ইতিহাসের আদালতে কোনো দলই চিরস্থায়ী ক্ষমতাবান নয়।
আজ যে মিছিলের সামনে, কাল সে মিছিলের পেছনে।
আজ যে শাসক, কাল সে অভিযুক্ত।
আজ যে পালায়, কাল সে ফিরতেও পারে।
কিন্তু ফিরে এসে যদি আবার পুরোনো মানুষটিই ফিরে আসে—
তাহলে ইতিহাস শুধু প্রশ্ন করবে না,
“কেন পতন হয়েছিল?”
তারচেও আরও কঠিন প্রশ্ন করবে—
“পতনের পরও কিছু শিখলা না ক্যেন?”
ফুডনোটঃ মুক্তমত কলামে এই লেখাটা লেখকের নিজস্ব চিন্তার খোরাক। এখানে সম্পাদক বা প্রকাশক দায়ী নন।
আব্দুস সামাদ আজাদ বিপু 























