বাঙালি জাতির ইতিহাস রক্তে লেখা—কিন্তু সেই রক্তের দাগ মুছতে আমরা অদ্ভুত রকম পারদর্শী।
আমরা ভুলে যাই। বারবার ভুলে যাই। পরিকল্পিতভাবে, সুবিধামতো।
ব্রিটিশ শাসনে এই জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া হয়েছিল শোষণ আর দুর্ভিক্ষ দিয়ে। নীলের চাষে কৃষকের কান্না, ৪৩–এর মন্বন্তরে লাখো লাশ—সবই ছিল আমাদের স্বাধীনতার আগের মূল্য। কিন্তু আজ কতজন সেই ক্ষুধার ইতিহাস মনে রাখে? আমরা শুধু বইয়ের পাতায় রেখে দিয়েছি, হৃদয়ে নয়।
পাকিস্তানি শাসনে বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতি আর অস্তিত্বকে বন্দুকের নলের সামনে দাঁড় করানো হয়েছিল। ১৯৫২–এর রক্ত, ১৯৬৯–এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১–এর গণহত্যা—এসব শুধু তারিখ হয়ে গেছে। শহীদ মানে এখন পোস্টার, স্লোগান, উৎসবের মাইক। আত্মত্যাগ মানে ছুটির দিন। ধর্ষিত মা-বোনদের গল্প আমরা “অস্বস্তিকর” বলে এড়িয়ে যাই—
স্বাধীনতার পরও শোষণ থামেনি—শুধু মুখ বদলেছে। স্বৈরাচার এসেছে দেশপ্রেমের মুখোশ পরে। রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার হয়েছে নিজের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে। গণতন্ত্র হয়েছে অলংকার, বিচার হয়েছে বিলাসিতা। যারা প্রতিবাদ করেছে, তারা হয়েছে নিখোঁজ, গুলিবিদ্ধ, কারাবন্দি—আর আমরা ধীরে ধীরে তাদের নাম ভুলে গেছি।
আর সাম্প্রতিক ফ্যাসিস্ট শক্তির উত্থান—যেখানে ভয়ের শাসন, মতের দমন, নারী নির্যাতন, রাষ্ট্রীয় সহিংসতা আবার স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। শহীদের তালিকা লম্বা হয়, স্মৃতির তালিকা ছোট হয়। ধর্ষণের খবর আসে, আমরা স্ক্রল করে চলে যাই। পরিসংখ্যান দেখি, মানুষ দেখি না।
এটাই আমাদের বাঙালির, বাংলাদেশী জাতিগোষ্ঠীর সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি—আমরা সংগ্রাম করি, রক্ত দিই, কিন্তু স্মৃতি রক্ষা করি না।
আমরা শহীদ চাই, কিন্তু শহীদের দায় নিতে চাই না।
আমরা ইতিহাস চাই গৌরবের জন্য, দায়বদ্ধতার জন্য নয়।
যে জাতি তার শহীদদের ভুলে যায়, সে জাতি ভবিষ্যতে আরও শহীদ জন্ম দিতে প্রস্তুত থাকে।
যে জাতি ধর্ষিতদের কণ্ঠ চেপে ধরে, সে জাতি নিজেই একদিন অপরাধীর পাশে দাঁড়ায়।
বাঙালি আজ ভুলে যাওয়া এক জাতি—কারণ মনে রাখা মানে প্রশ্ন করা, মনে রাখা মানে লড়াই চালিয়ে যাওয়া, আর আমরা ক্লান্ত বা সুবিধাবাদী।
লেখক; আব্দুস সামাদ আজাদ বিপু, বিশেষ প্রতিবেদক, নির্ভীক সংবাদ , নির্বাহী সম্পাদক, অল ইভেন্ট নিউজ এজেন্সি E-mail:bepubd@gmail.com
আব্দুস সামাদ আজাদ বিপু 






















