ঢাকার প্রাণকেন্দ্র মোহাম্মদপুরে অবস্থিত জেনেভা ক্যাম্প, যা বিহারী ক্যাম্প নামে বেশি পরিচিত। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে একটি ঘনবসতিপূর্ণ বস্তি, কিন্তু ভেতরে ঢুকলে বোঝা যায় এটি ৫৫ বছরের বৈষম্যের এক জীবন্ত জাদুঘর।
সরেজমিনে যা দেখা গেল:
বর্তমানে এই ক্যাম্পে বসবাস করছে প্রায় *৪৫,০০০ মানুষ*। মোট জায়গার পরিমাণ মাত্র *১৫ শতক ৭২ পয়েন্ট*। এইটুকু জায়গায় ৪৫ হাজার মানুষের বসবাস কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। একটি ৮ ফুট বাই ৮ ফুট ঘরে গাদাগাদি করে থাকছে ৫ থেকে ৮ জন মানুষ।
প্রধান সমস্যা – মাদক ও বেকারত্ব:
গত *১০-১২ বছর ধরে* এই ক্যাম্পে একটি চিহ্নিত চক্র পরিকল্পিতভাবে মাদক ব্যবসা ছড়িয়ে দিয়েছে। বেকারত্বের সুযোগ নিয়ে ক্যাম্পের কিশোর-কিশোরী, ছেলেমেয়েদের মাদকে আসক্ত করা হচ্ছে।
আমাদের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এখানে কোনো খেলার মাঠ নেই। ছেলেমেয়েদের খেলাধুলার কোনো সুযোগ নেই। বেকার যুবকরা দিনের পর দিন ঘরে বসে থাকে, আর সেই হতাশাকে পুঁজি করেই মাদক ব্যবসায়ীরা তাদের টার্গেট করছে। এটাই এখন ক্যাম্পের এক নম্বর সমস্যা।
শিক্ষা – ১৯৭৪ থেকে চলা একটি স্কুল:
১৯৭৪ সালের পর থেকে এই ক্যাম্পে একটি স্কুল চলছে, যা আজও *অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত*। এর উপরে পড়ার কোনো সুযোগ ক্যাম্পের ভেতরে নেই। বর্তমানে এই স্কুলে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা মাত্র *৫৫০ জন*। ৪৫ হাজার মানুষের মধ্যে ৫৫০ জন ছাত্র মানে শিক্ষার হার কতটা কম, তা সহজেই অনুমেয়। বাইরের স্কুলে গেলে তাদের উর্দুভাষী বলে বৈষম্যের শিকার হতে হয়।
ভোটার হয়েও নাগরিক নয়:
২০০৮ সালে হাইকোর্টের রায়ে তারা ভোটাধিকার পেয়েছে। বর্তমানে এই ক্যাম্পে ভোটার সংখ্যা প্রায় *১৮,০০০ জন*। কিন্তু ভোটার হয়েও তারা পূর্ণ নাগরিক সুবিধা পাচ্ছে না। তাদের জায়গার মালিকানা নেই, উচ্ছেদ আতঙ্কে থাকে সারাক্ষণ।
বৈষম্যের নির্মম ইতিহাস:
ক্যাম্পবাসীরা যে কতটা বৈষম্যের শিকার, তার দুটি ভয়াবহ উদাহরণ পাওয়া গেছে:
১. *২০০৫ সালের বিদ্যুৎ ট্র্যাজেডি:* ২০০৫ সালে টানা *১২ দিন* ক্যাম্পে বিদ্যুৎ ছিল না। প্রচণ্ড গরমে, অন্ধকারে, চিকিৎসা না পেয়ে অনেক *গর্ভবতী মহিলা মারা যায়*। এটি ছিল মানবতার ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক ঘটনা।
২. *দিল্লি চুক্তি ও ফিরে না যাওয়া:* *৯ই জুলাই ১৯৭৪ সালে* দিল্লি চুক্তির সময় *১ লক্ষ ৭৪ হাজার* উর্দুভাষী মানুষ পাকিস্তানে চলে যায়। যারা থেকে গিয়েছিল, তারা ভেবেছিল পাকিস্তান তাদের পরে নিয়ে যাবে। কিন্তু পাকিস্তান আর নেয়নি। আবার *১০ই জানুয়ারি ১৯৯৩ সনে* শেষবারের মতো *৫৩ পরিবারের ৩২৫ জন* মানুষ পাকিস্তানে যায়। এরপর থেকে পাকিস্তান দরজা পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। ফলে তারা বাংলাদেশেও নাগরিক নয়, পাকিস্তানেও নয় – রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ে।
উপসংহার:
৪৫ হাজার মানুষ, ১৫ শতক জায়গা, একটি অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত স্কুল, কোনো মাঠ নেই, ১৮ হাজার ভোটার হয়েও বৈষম্য। মাদক দিয়ে একটি প্রজন্মকে শেষ করে দেওয়া হচ্ছে। ১৯৭৪ সালে যে অস্থায়ী ক্যাম্প হয়েছিল, ২০২৬ সালেও তা একই আছে। এটি শুধু বিহারী ক্যাম্পের সমস্যা নয়, এটি বাংলাদেশের মানবাধিকারের প্রশ্ন। অবিলম্বে তাদের স্থায়ী পুনর্বাসন, মাঠ ও পূর্ণাঙ্গ স্কুল এবং মাদক থেকে রক্ষা করা না গেলে এই জনগোষ্ঠী আরও অন্ধকারে হারিয়ে যাবে।
আনিসুর রহমান মোল্লা, নিজস্ব প্রতিবেদক 
















