গর্ভধারিণী মা ও জন্মদাতা পিতার হাতেই নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন খুলনা সরকারি ইকবালনগর মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী আরফানা হোসেন নির্জনা (১৬)। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে নির্জনার মা আরিফা ইয়াসমিন সিমা (৩৫) জানিয়েছেন, অবাধ্যতার কারণে ঘটনার দিন বিকালে মেয়ের সঙ্গে তার বাকবিতন্ডা হয়। এক পর্যায়ে মেয়েকে কয়েকটি চড়-থাপ্পড় মারেন তিনি। ঘরের ভেতর শোরগোল শুনে নেশাগ্রস্ত বাবা আলীম হোসেন আকাশ এসে তাদের উভয়কে চুপ করতে বলেন। কিন্তু মেয়ে চুপ না থাকায় তিনি (বাবা) একটি কাঠের চলা দিয়ে তার মাথায় আঘাত করেন। এতে সে মাথা ফেটে রক্তাক্ত অবস্থায় ফ্লোরে পড়ে গিয়ে আর্তচিৎকার করে ওঠে। তখন বাবা তার মুখ চেপে ধরলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। এ সময় তারা হতচকিত হয়ে পড়ে। এরপর নির্জনার বাবা ঘরের ভেতরে থাকা ছেঁড়া লুঙ্গি ও একটি প্লাষ্টিকের বস্তায় নির্জনার লাশ মোটরসাইকেলে বেঁধে নগরীর নিরালা প্রান্তিকা আবাসিক এলাকার একটি সাততলা ভবনের ফেলে রেখে আসে । গত শুক্রবার নির্জনার মা সিমা স্বেচ্ছায় ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় বিজ্ঞ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও প্রদান করেন। একাধিক ছেলের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ও পারিবারিক কলহের জের ধরেই তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে আদালতে জানিয়েছেন তিনি। খুলনা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ইব্রাহীম খলিল মুহিম আরিফা ইয়াসমিন সিমার জবানবন্দি রেকর্ড করেন। পরে তাকে জেলহাজতে পাঠানো হয়।
এদিকে গতকাল শনিবার সকালে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) সদর দপ্তরে পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান, গত বুধবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে নিরালা প্রান্তিকা আবাসিক এলাকার ৩ নম্বর সড়কের একটি সাততলা ভবনের সামনে বস্তাবন্দি অবস্থায় নির্জনার মরদেহ দেখতে পেয়ে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দেয়। পরে পুলিশ মরদেহটি উদ্ধার করে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায় ও তদন্ত কার্যক্রম শুরু করে। তদন্তের শুরুতেই নিহতের পরিচয় শনাক্তে সিসিটিভি ফুটেজ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা হয়। একপর্যায়ে নিহতের পরিচয় শনাক্ত হওয়ার পর পুলিশ বাদী হয়ে সদর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করে।
তিনি বলেন, পুলিশি তদন্তের ২৪ ঘণ্টার ভেতর নিহতের পরিচয় আরফানা হোসেন নির্জনা হিসেবে শনাক্ত হয়। তিনি সোনাডাঙ্গা থানার বসুপাড়া এলাকার বাসিন্দা এবং মো. আলিম হোসেন আকাশ ও আরিফা ইয়াসমিন সিমা দম্পতির কন্যা। পরবর্তীতে খুলনা সদর থানা পুলিশ নিহতের বাসায় গিয়ে তার মা আরিফা ইয়াসমিন সিমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি প্রথমে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদান করেন। পরে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তিনি স্বীকার করেন, তার মেয়ে বিভিন্ন ছেলেদের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলে, যার ফলশ্রুতিতে তাদের মধ্যে পারিবারিক কলহ সৃষ্টি হয়। আর এই পারিবারিক কলহের কারণেই নিজ কন্যা আরফানা হোসেন নির্জনা এই হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। হত্যার পর মরদেহ প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে খুলনা সদর থানা এলাকার নিরালা প্রান্তিকা আবাসিক এলাকার ৩ নম্বর রোডে ফেলে রেখে ঘটনাটি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেন।
প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি আরো বলেন, ঘটনার মূল রহস্য উদঘাটন করতে খুলনা সদর থানা পুলিশের একটি আভিযানিক টিম মাত্র ৩৬ ঘন্টার শুক্রবার আরিফা ইয়াসমিন সিমাকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন। পরবর্তীতে তিনি স্বেচ্ছায় ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আদালতে দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এ ঘটনায় জড়িত অপর আসামি আরফানা হোসেন নির্জনার বাবা মো. আলিম হোসেন আকাশকে গ্রেফতারের জন্য পুলিশের অভিযান ও তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। কেএমপির ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) মো. রেজাউর রহমানের নেতৃত্বে একটি চৌকস আভিযানিক টিম অভিযান চালাচ্ছে।
পুলিশ কমিশনার বলেন, নিহত নির্জনার বাবা-মা দুজনই নেশাগ্রস্ত বলে পুলিশের কাছে তথ্য এসেছে।
প্রেস ব্রিফিংয়ে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মুহাম্মদ শাহনেওয়াজ খালেদ, ডেপুটি পুলিশ কমিশনার এম এম শাকিলুজ্জামান, ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) মো. রেজাউর রহমান, অতি. ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) অমিত কুমার বর্মন, সহকারী পুলিশ কমিশনার (খুলনা জোন) মো. শফিকুল ইসলাম, খুলনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শফিকুল ইসলাম প্রমুখ।
সংবাদ শিরোনাম
বাবা-মায়ের হাতেই মারা যায় স্কুলছাত্রী নির্জনা
-
খুলনা ব্যুরো - আপলোড সময় ০৫:২৪:৩৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬
- 26
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ
























