সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জের শতমুখি খাল এলাকায় বন বিভাগের স্মার্ট পেট্রোল টিমের গুলিতে এক কাঁকড়া শিকারি নিহত হয়েছেন। নিহতের নাম আমিনুর রহমান গাজী (৪৫)। তিনি সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের ৯ নম্বর সোরা গ্রামের বাসিন্দা এবং আকসেদ গাজীর ছেলে।
সোমবার সকাল ১০টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। নিহতের সঙ্গে থাকা অন্য জেলেরা অভিযোগ করেছেন, বৈধ পাস নিয়ে কাঁকড়া আহরণ করতে গিয়েছিলেন তাঁরা। পেট্রোল টিম ডাক দিলে সাড়া দিতে সামান্য দেরি হওয়ায় গুলি চালানো হয়। এতে আমিনুর ঘটনাস্থলেই মারা যান।
জেলেদের অভিযোগ
নিহতের সঙ্গী জেলে রমজান আলী গাজী বলেন, “চার দিন আগে বৈধ পাস নিয়ে আমিনুর, আহম্মদ, সেলিম ও আমি সুন্দরবনে যাই। শতমুখি খালে কাঁকড়া ধরার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় খুলনা স্মার্ট পেট্রোল টিম আমাদের ডাকে। কাছে যেতে কিছুটা সময় লাগায় তারা গুলি ছোড়ে। আমিনুর গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। ঘটনার পর টিম দ্রুত স্থান ত্যাগ করে।”
জেলেরা দাবি করেন, বৈধ অনুমতিপত্র থাকা সত্ত্বেও এমন ঘটনা ঘটেছে। এতে স্থানীয় বনজীবীদের মধ্যে ক্ষোভ তীব্র হয়েছে।
বন বিভাগের অবস্থান
বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন কর্মকর্তা ফজলুর রহমান জানান, ঘটনার তদন্ত চলছে। তিনি বলেন, “সুন্দরবনে বনদস্যু নির্মূলে যৌথ বাহিনীর অভিযান চলছে। ঘটনাস্থলে ঠিক কী ঘটেছে এবং কার গুলিতে মৃত্যু হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”
বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অভয়ারণ্য এলাকায় কড়া নজরদারি চলছে। তবে নিহতের পরিবার ও স্থানীয়দের অভিযোগ, বৈধ পাসধারীদের ওপরও অযাচিতভাবে গুলি চালানো হয়েছে।
স্থানীয় প্রতিক্রিয়া ও হামলা
ঘটনার জেরে বিকেলে কয়েকশ ক্ষুব্ধ জেলে লাঠিসোঁটা নিয়ে বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন অফিস ও সাতক্ষীরা রেঞ্জ অফিসে হামলা চালান। প্রায় ৩০-৪০ মিনিট ধরে চলা এ হামলায় অফিসের আসবাবপত্র ভাঙচুর করা হয়। হামলায় পাঁচ বনকর্মী আহত হয়েছেন। আহতরা হলেন:
ফরেস্টার শেখ মো. ফারুক আহমেদ (৫৫)
বনরক্ষী মেজবাউল ইসলাম (৪৫)
ফায়জুর রহমান (৪০)
আজাদুল ইসলাম (৪২)
স্বেচ্ছাসেবক এখলাছুর রহমান (২৭)
গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মাসুদুল আলম বলেন, “জেলেরা অন্যায় গুলির অভিযোগ করেছেন। বিভাগীয় বন সংরক্ষক তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।” নিহতের মরদেহ গ্রামে নিয়ে আসার পর স্থানীয়দের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
সুন্দরবনের জীবিকা ও সংঘাতের প্রেক্ষাপট
সুন্দরবন বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন এবং ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য। লক্ষাধিক মানুষ এখানে জীবিকা নির্বাহ করেন — মৌয়াল, জেলে, কাঠুরে, গোলপাতা সংগ্রাহকসহ। কাঁকড়া আহরণ অন্যতম প্রধান জীবিকা, বিশেষ করে শ্যামনগর, গাবুরা, মুন্সিগঞ্জ এলাকায়।
কাঁকড়া ধরতে গিয়ে প্রতি বছর অনেকে বাঘ, কুমিরের আক্রমণে প্রাণ হারান। পাশাপাশি বনদস্যু, বন বিভাগের সঙ্গে সংঘাতও নতুন নয়। বনদস্যু নির্মূলে যৌথ অভিযান চললেও সাধারণ জেলেদের ওপর চাপ বাড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বৈধ পাস নিয়েও হয়রানির অভিযোগ প্রায়ই উঠে।
এ ঘটনা সুন্দরবনের জীবন-জীবিকা, বন সংরক্ষণ ও মানুষের অধিকারের মধ্যে সংঘাতকে আবার সামনে এনেছে। স্থানীয়রা দাবি করছেন, বন বিভাগ ও জেলেদের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। অন্যথায় এমন ঘটনা বারবার ঘটবে।
তদন্ত ও পরিস্থিতি
প্রশাসন ও বন বিভাগ ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী (বিজিবি, নৌ পুলিশ, কোস্টগার্ড) পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। নিহতের পরিবারকে সহায়তা ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে স্থানীয়রা সোচ্চার।
এ ধরনের ঘটনা সুন্দরবনের টেকসই উন্নয়ন ও জীবিকার সুরক্ষায় নতুন করে ভাবনার সুযোগ করে দিয়েছে। বিস্তারিত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর আরও পরিষ্কার হবে ঘটনার পুরো চিত্র।
(এই প্রতিবেদন বিভিন্ন সূত্র ও স্থানীয়দের বক্তব্যের ভিত্তিতে তৈরি। তদন্ত চলমান থাকায় বিস্তারিত তথ্য উন্মোচিত হলে আপডেট করা হবে।)
সংবাদ শিরোনাম ::
সুন্দরবনে বন বিভাগের গুলিতে কাঁকড়া শিকারি নিহত: উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে, বন অফিসে হামলা
-
মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন, ব্যুরো চীফ, খুলনা - আপডেট সময় ১০:০৪:২২ অপরাহ্ন, বুধবার, ২০ মে ২০২৬
- ১০ বার পড়া হয়েছে
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ























