সরকার বদলায়, দিন বদলায়, কিন্তু বদলায় না সাতক্ষীরা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) চিত্র। দীর্ঘ ২৭ বছর ধরে ঘুষ-বাণিজ্য সহ বিভিন্ন অনিয়ম দুর্নীতি ও একক আধিপত্য বিস্তারে রাজত্ব কায়েম করে যাচ্ছে হাওলাদার নামে এক হিসাব সহকারী। কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারীও নন।
অফিস সূত্রে জানা যায়, আব্দুর রহিম হাওলাদার মাষ্টাররোলে হিসাব সহকারী হিসেবে ১৯৯৯ সালের ১ এপ্রিল সাতক্ষীরা অফিসে যোগদান করেন। আবার শোনা গেছে, চুক্তি ভিত্তিক মেয়াদে প্রকল্পের আওতায় কাজ করছেন। অফিসের অনেক কর্মকর্তা ও কর্মচারী বদলি বা পদায়ন হয়েছেন কিন্তু হাওলাদার একই চেয়ারে থেকে গেছেন যুগের পর যুগ। তার চলাফেরা, হাবভাব, জীবন যাপন রাজা বাদশাহকে হার মানায়। এজন্য তার নাম দিয়েছেন মুকুট হীন রাজা।
হাওলাদারের মাসিক বেতন ১২ হাজার থেকে ১৬ হাজার টাকা। কিন্তু মাসিক খরচ লাখ টাকার উর্ধ্বে। বিদ্যুৎ বিল সহ ঘর ভাড়া প্রায় ১৫ হাজার টাকা। বাসায় কাজের লোকের বেতন ৫ হাজার টাকা। সন্তানদের লেখাপড়া খরচ ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। মাসিক বাজার খরচ ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা। শুধু মাত্র তার স্ত্রীর স্পেশাল জামা কাপড় ক্রয়ের খরচ মাসে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা। এছাড়াও রয়েছে পরিবারে চিকিৎসা সহ অন্যান্য খরচ। আয়ের বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মধ্যে তার এতো বিলাসীতা জীবন যাপন। এনিয়ে ব্যাপক গুঞ্জন রয়েছে অফিসে এবং বাহিরে।
তথ্য সূত্রে, অফিসের গোপনীয়তা ফাঁস, দাপ্তরিক ও প্রশাসনিক কাজে বিঘ্ন সৃষ্টি করা এবং আর্থিক অনিয়মসহ বিভিন্ন অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে ২০২২ সালের ৫ জুলাই তিনি চাকরিচ্যুত হন। হেড অফিসের কর্মকর্তাদের সাথে গভীর সখ্যতা গড়ে ওঠার কারণে ক্ষমতার জোরে প্রভাব খাটিয়ে তিনি স্বপদে বহাল রয়েছেন। তার ভয়ে তার বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে সাহস পায়না। মুকুট হীন রাজা আব্দুর রহিম হাওলাদার তার বাড়ী পটুয়াখালী জেলার বাউফল উপজেলার জামালকাটি গ্রামে। সেখানে তিনি অবৈধ উপার্জিত টাকা দিয়ে বিলাস বহুল বাড়ী করেছেন। বিভিন্ন ব্যাংকে নামে বেনামে একাউন্টে ও সঞ্চয়পত্রে টাকা জমা রেখেছেন।
সাতক্ষীরা এলজিইডি অফিসে হিসাব সহকারী হাওলাদারের বিরুদ্ধে লাগামহীন দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগের শেষ নেই। তার অনিয়মে অতিষ্ঠ ঠিকাদাররা তাকে আখ্যায়িত করেছেন এলজিইডির ‘দুর্নীতির মুকুটহীন রাজা হিসেবে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি কাজের বিলে বাধ্যতামূলক ৫ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন বানিজ্য। অতিরিক্ত টেবিল মানি ছাড়া তার কাছে ফাইল এক বিন্দুও নড়েনা। তার এই ঘুষের যাতাকলে পিষ্ট হয়ে অনেক ঠিকাদার আংশিক কাজ করে অসমাপ্ত রেখে পালিয়েছেন। দেশের উন্নয়ন অগ্রগতির প্রতি সরকারের কড়া নজর থাকলেও ঘুষের কমিশন টাকা না পেয়ে নানা অজুহাতে সরকারি কাজে বাধা। ১৫ শতাংশ কমিশন না পেলে অনেক প্রকল্প কাজের ইস্যুকৃত টাকার চেক আটকিয়ে রাখে।
অভিযোগ সূত্রে, দরপত্রে অংশ নিয়ে লটারির মাধ্যমেই কাজ পান ঠিকাদাররা। তবুও কাজের চুক্তি, কার্যাদেশ ও কার্যক্রমের প্রতিটি পদক্ষেপেই গুণতে হয় ঘুষের টাকা। এ ধরনের দুর্নীতি যেন সাতক্ষীরা এলজিইডির নিয়ম-নীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শতভাগ কাজের ফাঁদ ও কমিশন বাণিজ্য নিয়ম অনুযায়ী ঠিকাদাররা কাজ সম্পন্ন করার পর বিল পাওয়ার কথা। কিন্তু হাওলাদার তৈরি করেছেন এক অদ্ভুত নিয়মের ফাঁদ। শতভাগ কাজ বুঝে নেওয়া’র অজুহাত দেখিয়ে তিনি দিনের পর দিন ফাইল আটকে রাখেন। মূলত এটি তার ঘুষ আদায়ের একটি কৌশল। ভুক্তভোগী ঠিকাদারদের অভিযোগ, কাজের মোট বরাদ্দের ৫ শতাংশ টাকা তাকে আগাম বুঝিয়ে না দিলে ফাইলের কোনো অগ্রগতি হয় না। এরপর বিলের চেক সই করানোর সময় দিতে হয় বাড়তি টেবিল মানি।
প্রভাবশালীদের নাম ভাঙিয়ে দাপটে অতিষ্ঠ ঠিকাদাররা।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের প্রভাব খাটিয়ে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন হাওলাদার। ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পরও তার দাপট কমেনি। বরং তিনি জামায়াতের কোলে বসে সেই একি রাজত্ব করে যাচ্ছেন। উর্ধ্বতন বড় বড় কর্মকর্তার ছত্রছায়া ও ঘনিষ্ঠতার দোহাই দিয়ে আগের চেয়েও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। ঠিকাদারদের হুমকি দিয়ে তিনি বলেন, তার খুঁটির জোর অনেক শক্ত তাই ঘুষ ছাড়া কোনো কাজ হবে না। নির্বাহী প্রকৌশলী ও অন্যান্য কর্মকর্তারা তার মতের বাহিরে গেলে তাকে করা হয় বদলি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে রাস্তা, গার্ডার ব্রিজ, সাইক্লোন শেল্টার ও ড্রেন নির্মাণসহ বিভিন্ন প্রকল্প শুরু হলেও অধিকাংশ কাজ শেষ না করেই ঘুষ দিয়ে ঠিকাদাররা অনেক প্রকল্পের অর্থ তুলে নিয়েছেন। এসব অনিয়মে স্থানীয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারাও সম্পৃক্ত বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। আবার অনেক ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান মোটা অঙ্কের কমিশন টাকা দিতে অস্বীকার করলে হাওলাদার প্রকল্পের পাশকৃত চেক আটকিয়ে রাখে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর থেকে ঠিকাদাররা কাজ ফেলে গা-ঢাকা দেয়।
এতে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড মুখ থুবড়ে পড়ে এবং চরম ভোগান্তিতে পড়েন স্থানীয় মানুষ। বিভিন্ন উপজেলার জনদুর্ভোগের মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এসব অপূর্ণ রাস্তা ও ভাঙা ব্রিজ। অনেক জায়গায় শুধু পাইলিং করে কাজ ফেলে রাখা হয়েছে; কোথাও বা রাস্তা খুঁড়ে ইট-বালু ফেলে রেখেছে। ফলে যান চলাচল তো দূরের কথা, হেঁটেও চলা কষ্টকর হয়ে উঠেছে।
নীরব ভূমিকায়, হাওলাদারের এমন প্রকাশ্যে ঘুষ বাণিজ্যের বিষয়ে একাধিকবার জেলা নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে অভিযোগ জানালেও রহস্যজনক কারণে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হয় না। ঠিকাদারদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে চলা এই অনিয়মের প্রতিকার না পাওয়ায় তাদের মনে ধারণা জন্মেছে যে, এই দুর্নীতির ভাগ হয়তো উপরের মহলেও পৌঁছে যায়।
উন্নয়ন কাজে স্থবিরতা ঘুষ না দিলে ফাইল নড়েনা। এই নীতির কারণে বিভিন্ন উপজেলায় সড়ক উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত বহু প্রকল্প স্থবির হয়ে পড়েছে। ঘুষের টাকা যোগাতে হিমশিম খাওয়া ঠিকাদাররা নিঃস্ব হয়ে অনেকে পেশা বদল করছেন। ফলে সরকারের উন্নয়ন কাজের মান ও গতি দুটোই ব্যাহত হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ঠিকাদারের অভিযোগ, সাতক্ষীরা এলজিইডি দুর্নীতির একটা আখড়ায় পরিণত হয়েছে, তারা যা খুশি তাই করছে।
সাতক্ষীরা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী না থাকায়, এবিষয়ে অন্যান্য কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎকার চাইলে তারা কৌশলে এড়িয়ে যায় এবং হাসতে হাসতে বলেন, নিউজ করে কোনো লাভ নেই, হাওলাদারের ক্ষমতার শিকড় অনেক লম্বা, মুখ খুললে বদলি হতে হবে।
সাতক্ষীরা অফিস 





















