আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ধামরাই উপজেলার রোয়াইল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে বিএনপির প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল আলিমকে ঘিরে। তবে নির্বাচনী প্রস্তুতির পাশাপাশি তাঁর ও তাঁর ছেলেদের বিরুদ্ধে অতীতে ওঠা একাধিক অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ভূমি দখলসংক্রান্ত অভিযোগ, চাঁদা দাবির অভিযোগ, মারধর, ভাঙচুর, মাদক সেবনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ এবং এক পীরের বাড়িতে হামলা ও গবাদিপশু নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ—সব মিলিয়ে তাঁর সম্ভাব্য প্রার্থিতা ঘিরে উঠছে নানা প্রশ্ন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবকে কেন্দ্র করে কিছু বিরোধের ক্ষেত্রে তাঁরা ন্যায়বিচার ও কার্যকর প্রতিকার পাওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন। তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা, সংশ্লিষ্ট ঘটনায় আইনগত অগ্রগতি এবং আবদুল আলিমের বর্তমান নির্বাচনী অবস্থান স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্যও জানা জরুরি।
অতীতের অভিযোগ, বর্তমানের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা
স্থানীয় সরকারে জনপ্রতিনিধি হওয়ার আকাঙ্ক্ষা একজন রাজনৈতিক নেতার গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর অভিযোগগুলোর স্বচ্ছ ব্যাখ্যা থাকা জনস্বার্থের বিষয়। কারণ, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্বের সঙ্গে সাধারণ মানুষের অধিকার, জমিজমাসংক্রান্ত বিরোধ, সামাজিক নিরাপত্তা এবং স্থানীয় পর্যায়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন জড়িত।
আবদুল আলিমের বিরুদ্ধে ভূমি দখল ও চাঁদা দাবিসহ বিভিন্ন অভিযোগের কথা স্থানীয় পর্যায়ে আলোচিত হলেও এসব বিষয়ে নির্দিষ্ট মামলা, সরকারি নথি, ভুক্তভোগীদের লিখিত অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য যাচাই করে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন। অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা যায় না; তবে অভিযোগগুলো গুরুতর হলে সেগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
ছেলেদের বিরুদ্ধে মাদক সেবন ও সংঘর্ষের অভিযোগ
এর আগে সাভার পৌরসভার জ্বালেশ্বর এলাকায় খ্রিষ্টান কলেজসংলগ্ন প্রয়াত দুলালের বাড়িতে সাব্বির মাহমুদ, আবদুল বারেক তুষারসহ কয়েকজনের ইয়াবা সেবনের অভিযোগ ওঠে। স্থানীয়দের দাবি, তাঁরা কয়েকজনকে আটক করে সাভার মডেল থানায় খবর দেন। খবর পেয়ে গণমাধ্যমকর্মীরাও ঘটনাস্থলে যান।

অভিযোগ অনুযায়ী, পুলিশ পৌঁছানোর আগেই সাব্বিরের বাবা আবদুল আলিম লোকজন নিয়ে সেখানে উপস্থিত হন। এরপর স্থানীয়দের সঙ্গে সংঘর্ষ ও মারামারির ঘটনা ঘটে এবং আটক ব্যক্তিদের সেখান থেকে নিয়ে যাওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন এলাকাবাসী। ওই সংঘর্ষে আবদুল আলিমের কান কেটে যাওয়ার এবং পরে সেলাই দেওয়ার তথ্যও স্থানীয় সূত্রে উঠে এসেছে।
তবে মাদক সেবনের অভিযোগ, সংঘর্ষের প্রকৃত পরিস্থিতি এবং কারা প্রথম হামলা চালিয়েছিলেন—এসব বিষয়ে পুলিশের নথি, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
পীরের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও খাসি নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ
এ ঘটনার পরদিন ধামরাইয়ের রোয়াইল ইউনিয়নের চরসঙ্গুর গ্রামে পীর শাহ শামসুদ্দিনের বাড়িতে হামলা, সিসিটিভি ক্যামেরা ভাঙচুর, কেয়ারটেকারকে মারধর এবং দুটি খাসি নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে আবদুল আলিমের দুই ছেলে সাব্বির মাহমুদ ও আবদুল বারেক তুষারের বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগী শাহ শামসুদ্দিনের অভিযোগ, অভিযুক্তরা বাড়ির দেয়াল টপকে ভেতরে প্রবেশ করেন এবং তাঁর বাড়ির নিরাপত্তা ক্যামেরা ভাঙচুর করেন। এ সময় কেয়ারটেকার মাসুদকে মারধর করে আহত করা হয়। পাশাপাশি আনুমানিক ৩০ হাজার টাকা মূল্যের দুটি খাসি নিয়ে যাওয়া হয় বলেও তিনি দাবি করেন।
শাহ শামসুদ্দিন আরও জানান, গত ৭ আগস্ট ২০২৬ তারিখ সকাল ১১টার দিকে তিনি এ ঘটনায় ধামরাই থানায় অভিযোগ দিতে যান। তাঁর দাবি, অভিযোগ দেওয়ার পরও মামলা গ্রহণ করা হয়নি। তবে অভিযোগটি থানায় কীভাবে নথিভুক্ত হয়েছে, তদন্ত হয়েছে কি না এবং মামলা গ্রহণ না করার কোনো আনুষ্ঠানিক কারণ রয়েছে কি না—তা সংশ্লিষ্ট পুলিশের বক্তব্য ছাড়া নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
দেড় লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ
আবদুল আলিমের বিরুদ্ধে ইসহাক আলী নামের এক ব্যক্তির কাছে দেড় লাখ টাকা চাঁদা দাবি এবং টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁকে মারধরের অভিযোগও রয়েছে। তবে এ বিষয়ে অভিযোগের কপি, ঘটনার তারিখ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং পুলিশের পদক্ষেপ সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। এসব তথ্য যাচাই হলে অভিযোগটির প্রকৃত অবস্থা স্পষ্ট হবে।
বিচার ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী, কিছু ঘটনার পর তাঁরা প্রত্যাশিত প্রতিকার পাননি। এ ধরনের অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু ব্যক্তিগত বিরোধের বিষয় নয়; বরং আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, নাগরিক অধিকার এবং স্থানীয় পর্যায়ে জবাবদিহির প্রশ্নও সামনে আনে।
তবে কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে বিচারব্যবস্থা বা পুলিশকে পক্ষপাতদুষ্ট বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে অভিযোগের নথি, তদন্তের অগ্রগতি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য যাচাই করা জরুরি। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ যথাযথভাবে গ্রহণ, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিশ্চিত করা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।
চেয়ারম্যান প্রার্থী হলে প্রশ্নগুলোর জবাব দেবেন কে?
রোয়াইল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদে আবদুল আলিম প্রার্থী হতে চাইলে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর অভিযোগগুলোর বিষয়ে জনসমক্ষে স্পষ্ট বক্তব্য দেওয়া এবং প্রাসঙ্গিক নথি দিয়ে অভিযোগগুলোর ব্যাখ্যা করা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ভূমি দখল, চাঁদা দাবি, তাঁর ছেলেদের বিরুদ্ধে ওঠা হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ এবং থানায় অভিযোগের পরবর্তী অগ্রগতি—এসব প্রশ্নের উত্তর জনস্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
রাজনৈতিক পরিচয় কাউকে অপরাধী প্রমাণ করে না, আবার রাজনৈতিক পরিচয় কারও বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের
দিলশান আরা অনিমা 






















