ভালো কাজ বন্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ স্থানীয়দের, ২৪৮ জনের বিরুদ্ধে আগের মামলাও আলোচনায়
চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় একটি মাঠ সংস্কার ও জনকল্যাণমূলক উদ্যোগকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। মসজিদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির জায়গা সংস্কার করে শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা, ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং মৃত ব্যক্তির জানাজা আয়োজনের উপযোগী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই উদ্যোগের বিরোধিতা এবং পরবর্তী সময়ে ২৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
মামলার বাদী শাহজাহানের বিরুদ্ধে স্থানীয় একাধিক ব্যক্তির অভিযোগ, তিনি বিভিন্ন সময় মামলা-মোকদ্দমায় জড়িয়ে মানুষকে হয়রানি করেন। তাঁদের দাবি, জনস্বার্থে মাঠ সংস্কারের উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত করতেই এবার মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই এবং অভিযুক্তের বক্তব্য পাওয়া জরুরি।
জনস্বার্থের মাঠ সংস্কারই কি বিরোধের মূল কারণ?
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট জায়গাটি মসজিদ, স্কুল ও ওয়াক্ফ এস্টেটের সম্পত্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। জায়গাটির যথাযথ ব্যবহার ও সংস্কারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা, ওয়াজ মাহফিল এবং জানাজার মতো সামাজিক ও ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল।
এ উদ্যোগকে কেন্দ্র করে শাহজাহানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরোধ তৈরি হয় বলে দাবি স্থানীয়দের। তাঁদের ভাষ্য, মাঠ সংস্কারের বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে তিনি মামলা করার হুমকি দেন। পরবর্তী সময়ে বিরোধ আরও জটিল আকার ধারণ করে।
স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, মাঠ সংস্কারের উদ্যোগে গঠনমূলক সহযোগিতা না করে বিরোধ সৃষ্টি করা হয়েছে। তাঁদের প্রশ্ন, জায়গাটির মালিকানা, ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও বৈধ কমিটির থাকলে সেখানে ব্যক্তিগত বিরোধের অবকাশ কেন তৈরি হবে?
২৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা, উদ্বেগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা
স্থানীয় সূত্রের দাবি, বিরোধের জেরে মসজিদ কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানসহ বর্তমান ও সাবেক উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট মোট ২৫ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
এ ঘটনায় মসজিদ কমিটি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কয়েকজন।
তাঁদের অভিযোগ, জনকল্যাণমূলক কাজে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের মামলায় জড়িয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। তবে মামলার এজাহার, অভিযোগের সুনির্দিষ্ট বিবরণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো প্রয়োজন।
সাংবাদিক মিজানকে হেনস্তার অভিযোগ ঘিরেও প্রশ্ন
এ ঘটনায় সাংবাদিক মিজানকে হেনস্তা, মারধর কিংবা তাঁর মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ নিয়েও ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া গেছে।
স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, ঘটনাটি যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, বাস্তবে তা তেমন ছিল না। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, মাটি ফেলা নিয়ে বিরোধের সময় চাঁদা দাবির অভিযোগ ওঠে এবং খোরশেদ নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে সাংবাদিক মিজানের হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।
তবে চাঁদা দাবির অভিযোগ, মারধরের ঘটনা কিংবা প্রশাসনের সংশ্লিষ্টতা—কোনোটিই স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তাই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
২৪৮ জনের বিরুদ্ধে আগের মামলাও আলোচনায়
স্থানীয়দের বক্তব্যে আরও উঠে এসেছে, এর আগে ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় ২৪৮ জনকে আসামি করে একটি বিস্ফোরক আইনে মামলা দায়েরের বিষয়টি এলাকায় আলোচনায় ছিল।
তাঁদের দাবি, ওই মামলায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী, ইটভাটা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং বাদীর আত্মীয়স্বজনের নামও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ কারণে মামলাটির উদ্দেশ্য ও আসামি নির্বাচনের যৌক্তিকতা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।
তবে আগের মামলার এজাহার, আসামিদের পরিচয় এবং মামলার বর্তমান অবস্থা যাচাই না করে এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত মন্তব্য করা সমীচীন নয়।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি এলাকাবাসীর
স্থানীয়দের অভিযোগ, একের পর এক মামলা ও বিরোধের কারণে এলাকায় সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। তাঁদের মতে, কোনো জনকল্যাণমূলক উদ্যোগকে ব্যক্তিগত বিরোধের কারণে বাধাগ্রস্ত করা উচিত নয়। একই সঙ্গে কারও বিরুদ্ধে মামলা হলেই তাঁকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
তাঁরা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে দাবি জানিয়েছেন, মাঠের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনার বিষয়টি যাচাই, ২৫ জনের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত এবং সাংবাদিক মিজানকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করা হোক।
প্রশাসনের করণীয় কী?
একটি মাঠের জায়গা নিয়ে বিরোধ, জনকল্যাণমূলক উদ্যোগে বাধা, সাংবাদিককে হেনস্তার অভিযোগ এবং একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা—সবকিছু মিলিয়ে লোহাগাড়ার ঘটনাটি নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাখে।
সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসন, থানা পুলিশ ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের উচিত অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া। একই সঙ্গে মসজিদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ওয়াক্ফ সম্পত্তির বৈধ মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
নির্ভীক সংবাদ-এর পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য, মামলার নথিপত্র এবং প্রশাসনিক তথ্য যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা তুলে ধরার উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে। অভিযুক্ত শাহজাহানের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।
আনিসুর রহমান মোল্লা 





















