ঢাকা ০৩:৩৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৬ অগাস্ট ২০২৬, ২১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
যে ডকুমেন্টারিতে আবু সাঈদ নেই, সেটি কোনো ডকুমেন্টারি নয়: ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি চোরাচালান ও দুর্নীতি: কোটি টাকার পণ্য পাচারের অভিযোগে বেনাপোলে কাস্টমস কর্মকর্তা ও আনসার সদস্য আটক নারায়ণগঞ্জে জুলাই বিপ্লব বার্ষিকী উপলক্ষে ১১ দলীয় ঐক্যের গণসমাবেশে মাওলানা আব্দুল হালিম এম পি ঘুষের পারমিট আর রাতের রুট: দুই ফাঁদে সুন্দরবন দায়িত্ব গ্রহণের পাঁচ মাসেই আধুনিক, পরিচ্ছন্ন ও দুর্নীতিমুক্ত নগর গড়ার প্রতিশ্রুতি প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জুর খুলনায় যথাযোগ্য মর্যাদায় জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস পালিত খুলনায় মার্কেন্টাইল ইসলামি লাইফের ক্লেইম ভোগান্তি: মেয়াদপূর্তি, সারেন্ডার ও মৃত্যুদাবির টাকা পেতে দীর্ঘ বিলম্বের অভিযোগ জুলাই স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস আজ খুলনা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি হাবিবের স্ত্রী’র মৃত্যুতে শোক

দায়িত্ব গ্রহণের পাঁচ মাসেই আধুনিক, পরিচ্ছন্ন ও দুর্নীতিমুক্ত নগর গড়ার প্রতিশ্রুতি প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জুর

খুলনা মহানগরকে একটি আধুনিক, পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও দুর্নীতিমুক্ত নগরীতে রূপান্তরের প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন খুলনা সিটি কর্পোরেশনের (KCC) প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু। দায়িত্ব গ্রহণের পাঁচ মাসের মাথায় তিনি বলেছেন, নাগরিকদের মতামত ও প্রয়োজনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই নগর উন্নয়নের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। জলাবদ্ধতা নিরসন, পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, যানজট নিয়ন্ত্রণ, ফুটপাত দখলমুক্ত করা, মশক নিধন এবং স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়ন—এসব খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

২০২৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি খুলনা সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন খুলনা-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপি নেতা নজরুল ইসলাম মঞ্জু। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি বিভিন্ন ওয়ার্ড পরিদর্শন, নাগরিকদের সঙ্গে মতবিনিময় এবং চলমান প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করছেন। সম্প্রতি নগর ভবনের শহীদ আলতাফ মিলনায়তনে আয়োজিত ‘নাগরিক ফোরাম’-এ অংশ নিয়ে তিনি খুলনা নগর উন্নয়নের একটি বিস্তৃত রূপরেখা তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, “নাগরিকদের সমস্যা ও চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়েই খুলনা মহানগরের উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হচ্ছে। জনগণের করের অর্থ জনগণের কল্যাণেই ব্যয় হবে। কোনো অনিয়ম বা কমিশন বাণিজ্য বরদাশত করা হবে না।”

জলাবদ্ধতা নিরসনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব

খুলনার অন্যতম বড় সমস্যা দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা। সামান্য বৃষ্টিতেই নগরীর বিভিন্ন সড়ক ও আবাসিক এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। এতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়ার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিক্ষা কার্যক্রমও ব্যাহত হয়।

এই সমস্যা সমাধানে প্রশাসক জানান, চলমান ড্রেনেজ উন্নয়ন প্রকল্প দ্রুত শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জোয়ারের সময় যাতে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশন করা যায়, সে জন্য প্রয়োজনীয় স্থানে আধুনিক পাম্প স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি বলেন, “জলাবদ্ধতা খুলনার বহু বছরের সমস্যা। এটি রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয়। তবে পরিকল্পিতভাবে কাজ করলে স্থায়ী সমাধান সম্ভব।”

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, খাল পুনরুদ্ধার, অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে জলাবদ্ধতা অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

পরিচ্ছন্ন নগর গঠনে নতুন পরিকল্পনা

পরিচ্ছন্ন নগর গড়তে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিকায়নের উদ্যোগ নিয়েছে KCC। প্রশাসক জানান, বর্জ্য রিসাইক্লিং সেন্টার চালুর মাধ্যমে আবর্জনাকে সম্পদে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি নাগরিকদের উদ্দেশে বলেন, “নির্ধারিত স্থান ছাড়া কোথাও ময়লা ফেলবেন না। পরিচ্ছন্ন শহর গড়তে নাগরিকদের সহযোগিতা অত্যন্ত প্রয়োজন।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু কর্পোরেশনের উদ্যোগ নয়, নাগরিকদের সচেতন অংশগ্রহণও পরিচ্ছন্ন নগর গঠনের অন্যতম শর্ত।

যানজট কমাতে নতুন ব্যবস্থা

খুলনা মহানগরে ইজিবাইকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় যানজট বেড়েছে। প্রশাসক জানিয়েছেন, বাইরের এলাকা থেকে নগরীতে অনিয়ন্ত্রিতভাবে ইজিবাইক প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, “যানবাহনের শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

ফুটপাত হবে পথচারীদের

ফুটপাত দখলমুক্ত করার বিষয়েও কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন প্রশাসক। অবৈধ স্থাপনা ও ফুটপাত দখল করে ব্যবসা পরিচালনার বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানোর ঘোষণা দেন তিনি।

তার ভাষায়, “পথচারীদের হাঁটার অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। ফুটপাত দখলমুক্ত করা হবে, তবে জীবিকার বিষয়টিও মানবিকভাবে বিবেচনা করা হবে।”

মশক নিধনে আধুনিক ব্যবস্থা

বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনার ঘোষণা দিয়েছেন প্রশাসক।

তিনি বলেন, “মশা নিয়ন্ত্রণে শুধু ওষুধ ছিটালেই হবে না। মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে নাগরিকদেরও দায়িত্ব নিতে হবে।”

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, জমে থাকা পানি অপসারণ এবং সচেতনতা বৃদ্ধিই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

স্যানিটেশন উন্নয়নে বিশেষ উদ্যোগ

নগরীর ৮ নম্বর ওয়ার্ডের পিপলস মিল এলাকায় ল্যাট্রিন নির্মাণ, ড্রেন সংস্কার এবং গণশৌচাগারে সুপেয় পানির ব্যবস্থা করার ঘোষণা দিয়েছেন প্রশাসক।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

দুর্নীতিমুক্ত KCC গড়ার ঘোষণা

প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, “KCC হবে শতভাগ দুর্নীতিমুক্ত। কোনো কমিশন বাণিজ্য হবে না। প্রতিহিংসাপরায়ণ না হয়ে সকল নাগরিককে সমান সেবা দেওয়া হবে।”

তার এই বক্তব্য নাগরিকদের মধ্যে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। অনেকেই মনে করছেন, প্রশাসনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে সেবার মানও উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে।

সন্ত্রাস ও মাদকবিরোধী অবস্থান

নগরী থেকে সন্ত্রাস ও মাদক নির্মূলে কঠোর অবস্থান নেওয়ার কথাও জানান প্রশাসক।

তিনি বলেন, “নিরাপদ শহর গড়তে অপরাধের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হবে।”

বাজেটে থাকবে নাগরিকদের প্রস্তাব

প্রশাসক জানান, ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট শিগগিরই ঘোষণা করা হবে।

তিনি বলেন, “নাগরিক ফোরামের দেওয়া অধিকাংশ প্রস্তাব বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। জনগণের মতামতকে আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি।”

বিশেষজ্ঞদের মত

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি সঠিক পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা গেলে খুলনার দীর্ঘদিনের সমস্যা অনেকটাই কমে আসবে।

তাদের মতে—ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন জরুরি।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তি ব্যবহার বাড়াতে হবে।

নগর পরিকল্পনা অনুযায়ী খাল ও জলাশয় সংরক্ষণ করতে হবে।

গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রয়োজন। নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। মানবিক অ্যাঙ্গেল: নাগরিকদের প্রত্যাশা

ড্রেন সংস্কার চাই” — ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা

৮ নম্বর ওয়ার্ডের এক বাসিন্দা বলেন, “বৃষ্টি হলেই পানি জমে যায়। অনেক সময় বাড়ি থেকে বের হওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। ড্রেনগুলো দ্রুত সংস্কার হলে আমরা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হব।”

ফুটপাত পথচারীদের জন্য ফিরিয়ে দিন

এক ব্যবসায়ী বলেন, “আমরা ব্যবসা করি ঠিকই, কিন্তু ফুটপাত পুরোপুরি দখল হয়ে গেলে ক্রেতারাও চলাচল করতে পারেন না। পরিকল্পিত সমাধান প্রয়োজন।”

প্রশাসকের জবাব

নাগরিকদের এসব দাবির জবাবে প্রশাসক বলেন, “ড্রেন সংস্কার, ফুটপাত ব্যবস্থাপনা, পরিচ্ছন্নতা ও স্যানিটেশন—এসব বিষয় বাজেটে গুরুত্ব পেয়েছে। ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে।”

সামনে যে চ্যালেঞ্জ

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রশাসকের ঘোষণাগুলো বাস্তবায়নের পথে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে।

দীর্ঘদিনের অসমাপ্ত প্রকল্প।

সীমিত বাজেট।

অবকাঠামোগত জটিলতা।

জনবল ও যন্ত্রপাতির ঘাটতি।

নাগরিক অসচেতনতা।

বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজন।

এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অতিবৃষ্টি ও জোয়ারের প্রভাবও খুলনার ড্রেনেজ ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।

নাগরিকদের প্রত্যাশা

খুলনাবাসীর প্রত্যাশা, ঘোষণাগুলো যেন কেবল বক্তব্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তবে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনে। তারা চান নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ, দ্রুত জলাবদ্ধতা নিরসন, মশক নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ সড়ক, দখলমুক্ত ফুটপাত এবং স্বচ্ছ প্রশাসনিক সেবা।

অনেকেই মনে করেন, নাগরিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে উন্নয়ন কার্যক্রম আরও কার্যকর হবে। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়মিত প্রকাশ করলে জনগণের আস্থাও বাড়বে।

উপসংহার

দায়িত্ব গ্রহণের পাঁচ মাসের মধ্যেই প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু যে উন্নয়ন অঙ্গীকার তুলে ধরেছেন, তা খুলনার দীর্ঘদিনের বিভিন্ন নাগরিক সমস্যার সমাধানের একটি রূপরেখা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এসব পরিকল্পনার সফলতা নির্ভর করবে সময়মতো বাস্তবায়ন, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, কার্যকর তদারকি এবং নাগরিক সহযোগিতার ওপর।

প্রশাসকের ভাষায়, “জনগণের সহযোগিতায় আধুনিক, বাসযোগ্য, নিরাপদ ও দুর্নীতিমুক্ত খুলনা গড়াই আমাদের মূল লক্ষ্য।”

Tag :
About Author Information

Nirvik Sangbad

জনপ্রিয় সংবাদ

যে ডকুমেন্টারিতে আবু সাঈদ নেই, সেটি কোনো ডকুমেন্টারি নয়: ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি

দায়িত্ব গ্রহণের পাঁচ মাসেই আধুনিক, পরিচ্ছন্ন ও দুর্নীতিমুক্ত নগর গড়ার প্রতিশ্রুতি প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জুর

আপলোড সময় ০৭:০৮:৩২ অপরাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬

খুলনা মহানগরকে একটি আধুনিক, পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও দুর্নীতিমুক্ত নগরীতে রূপান্তরের প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন খুলনা সিটি কর্পোরেশনের (KCC) প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু। দায়িত্ব গ্রহণের পাঁচ মাসের মাথায় তিনি বলেছেন, নাগরিকদের মতামত ও প্রয়োজনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই নগর উন্নয়নের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। জলাবদ্ধতা নিরসন, পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, যানজট নিয়ন্ত্রণ, ফুটপাত দখলমুক্ত করা, মশক নিধন এবং স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়ন—এসব খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

২০২৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি খুলনা সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন খুলনা-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপি নেতা নজরুল ইসলাম মঞ্জু। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি বিভিন্ন ওয়ার্ড পরিদর্শন, নাগরিকদের সঙ্গে মতবিনিময় এবং চলমান প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করছেন। সম্প্রতি নগর ভবনের শহীদ আলতাফ মিলনায়তনে আয়োজিত ‘নাগরিক ফোরাম’-এ অংশ নিয়ে তিনি খুলনা নগর উন্নয়নের একটি বিস্তৃত রূপরেখা তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, “নাগরিকদের সমস্যা ও চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়েই খুলনা মহানগরের উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হচ্ছে। জনগণের করের অর্থ জনগণের কল্যাণেই ব্যয় হবে। কোনো অনিয়ম বা কমিশন বাণিজ্য বরদাশত করা হবে না।”

জলাবদ্ধতা নিরসনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব

খুলনার অন্যতম বড় সমস্যা দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা। সামান্য বৃষ্টিতেই নগরীর বিভিন্ন সড়ক ও আবাসিক এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। এতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়ার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিক্ষা কার্যক্রমও ব্যাহত হয়।

এই সমস্যা সমাধানে প্রশাসক জানান, চলমান ড্রেনেজ উন্নয়ন প্রকল্প দ্রুত শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জোয়ারের সময় যাতে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশন করা যায়, সে জন্য প্রয়োজনীয় স্থানে আধুনিক পাম্প স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি বলেন, “জলাবদ্ধতা খুলনার বহু বছরের সমস্যা। এটি রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয়। তবে পরিকল্পিতভাবে কাজ করলে স্থায়ী সমাধান সম্ভব।”

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, খাল পুনরুদ্ধার, অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে জলাবদ্ধতা অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

পরিচ্ছন্ন নগর গঠনে নতুন পরিকল্পনা

পরিচ্ছন্ন নগর গড়তে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিকায়নের উদ্যোগ নিয়েছে KCC। প্রশাসক জানান, বর্জ্য রিসাইক্লিং সেন্টার চালুর মাধ্যমে আবর্জনাকে সম্পদে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি নাগরিকদের উদ্দেশে বলেন, “নির্ধারিত স্থান ছাড়া কোথাও ময়লা ফেলবেন না। পরিচ্ছন্ন শহর গড়তে নাগরিকদের সহযোগিতা অত্যন্ত প্রয়োজন।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু কর্পোরেশনের উদ্যোগ নয়, নাগরিকদের সচেতন অংশগ্রহণও পরিচ্ছন্ন নগর গঠনের অন্যতম শর্ত।

যানজট কমাতে নতুন ব্যবস্থা

খুলনা মহানগরে ইজিবাইকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় যানজট বেড়েছে। প্রশাসক জানিয়েছেন, বাইরের এলাকা থেকে নগরীতে অনিয়ন্ত্রিতভাবে ইজিবাইক প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, “যানবাহনের শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

ফুটপাত হবে পথচারীদের

ফুটপাত দখলমুক্ত করার বিষয়েও কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন প্রশাসক। অবৈধ স্থাপনা ও ফুটপাত দখল করে ব্যবসা পরিচালনার বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানোর ঘোষণা দেন তিনি।

তার ভাষায়, “পথচারীদের হাঁটার অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। ফুটপাত দখলমুক্ত করা হবে, তবে জীবিকার বিষয়টিও মানবিকভাবে বিবেচনা করা হবে।”

মশক নিধনে আধুনিক ব্যবস্থা

বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনার ঘোষণা দিয়েছেন প্রশাসক।

তিনি বলেন, “মশা নিয়ন্ত্রণে শুধু ওষুধ ছিটালেই হবে না। মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে নাগরিকদেরও দায়িত্ব নিতে হবে।”

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, জমে থাকা পানি অপসারণ এবং সচেতনতা বৃদ্ধিই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

স্যানিটেশন উন্নয়নে বিশেষ উদ্যোগ

নগরীর ৮ নম্বর ওয়ার্ডের পিপলস মিল এলাকায় ল্যাট্রিন নির্মাণ, ড্রেন সংস্কার এবং গণশৌচাগারে সুপেয় পানির ব্যবস্থা করার ঘোষণা দিয়েছেন প্রশাসক।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

দুর্নীতিমুক্ত KCC গড়ার ঘোষণা

প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, “KCC হবে শতভাগ দুর্নীতিমুক্ত। কোনো কমিশন বাণিজ্য হবে না। প্রতিহিংসাপরায়ণ না হয়ে সকল নাগরিককে সমান সেবা দেওয়া হবে।”

তার এই বক্তব্য নাগরিকদের মধ্যে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। অনেকেই মনে করছেন, প্রশাসনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে সেবার মানও উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে।

সন্ত্রাস ও মাদকবিরোধী অবস্থান

নগরী থেকে সন্ত্রাস ও মাদক নির্মূলে কঠোর অবস্থান নেওয়ার কথাও জানান প্রশাসক।

তিনি বলেন, “নিরাপদ শহর গড়তে অপরাধের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হবে।”

বাজেটে থাকবে নাগরিকদের প্রস্তাব

প্রশাসক জানান, ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট শিগগিরই ঘোষণা করা হবে।

তিনি বলেন, “নাগরিক ফোরামের দেওয়া অধিকাংশ প্রস্তাব বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। জনগণের মতামতকে আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি।”

বিশেষজ্ঞদের মত

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি সঠিক পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা গেলে খুলনার দীর্ঘদিনের সমস্যা অনেকটাই কমে আসবে।

তাদের মতে—ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন জরুরি।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তি ব্যবহার বাড়াতে হবে।

নগর পরিকল্পনা অনুযায়ী খাল ও জলাশয় সংরক্ষণ করতে হবে।

গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রয়োজন। নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। মানবিক অ্যাঙ্গেল: নাগরিকদের প্রত্যাশা

ড্রেন সংস্কার চাই” — ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা

৮ নম্বর ওয়ার্ডের এক বাসিন্দা বলেন, “বৃষ্টি হলেই পানি জমে যায়। অনেক সময় বাড়ি থেকে বের হওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। ড্রেনগুলো দ্রুত সংস্কার হলে আমরা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হব।”

ফুটপাত পথচারীদের জন্য ফিরিয়ে দিন

এক ব্যবসায়ী বলেন, “আমরা ব্যবসা করি ঠিকই, কিন্তু ফুটপাত পুরোপুরি দখল হয়ে গেলে ক্রেতারাও চলাচল করতে পারেন না। পরিকল্পিত সমাধান প্রয়োজন।”

প্রশাসকের জবাব

নাগরিকদের এসব দাবির জবাবে প্রশাসক বলেন, “ড্রেন সংস্কার, ফুটপাত ব্যবস্থাপনা, পরিচ্ছন্নতা ও স্যানিটেশন—এসব বিষয় বাজেটে গুরুত্ব পেয়েছে। ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে।”

সামনে যে চ্যালেঞ্জ

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রশাসকের ঘোষণাগুলো বাস্তবায়নের পথে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে।

দীর্ঘদিনের অসমাপ্ত প্রকল্প।

সীমিত বাজেট।

অবকাঠামোগত জটিলতা।

জনবল ও যন্ত্রপাতির ঘাটতি।

নাগরিক অসচেতনতা।

বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজন।

এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অতিবৃষ্টি ও জোয়ারের প্রভাবও খুলনার ড্রেনেজ ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।

নাগরিকদের প্রত্যাশা

খুলনাবাসীর প্রত্যাশা, ঘোষণাগুলো যেন কেবল বক্তব্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তবে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনে। তারা চান নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ, দ্রুত জলাবদ্ধতা নিরসন, মশক নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ সড়ক, দখলমুক্ত ফুটপাত এবং স্বচ্ছ প্রশাসনিক সেবা।

অনেকেই মনে করেন, নাগরিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে উন্নয়ন কার্যক্রম আরও কার্যকর হবে। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়মিত প্রকাশ করলে জনগণের আস্থাও বাড়বে।

উপসংহার

দায়িত্ব গ্রহণের পাঁচ মাসের মধ্যেই প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু যে উন্নয়ন অঙ্গীকার তুলে ধরেছেন, তা খুলনার দীর্ঘদিনের বিভিন্ন নাগরিক সমস্যার সমাধানের একটি রূপরেখা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এসব পরিকল্পনার সফলতা নির্ভর করবে সময়মতো বাস্তবায়ন, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, কার্যকর তদারকি এবং নাগরিক সহযোগিতার ওপর।

প্রশাসকের ভাষায়, “জনগণের সহযোগিতায় আধুনিক, বাসযোগ্য, নিরাপদ ও দুর্নীতিমুক্ত খুলনা গড়াই আমাদের মূল লক্ষ্য।”