সুন্দরবনের সংবেদনশীল পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ঘিরে পর্যটন ব্যবসার বিস্তার ঘটলেও অনেক ক্ষেত্রে মানা হচ্ছে না পরিবেশ ও বন বিভাগের নিয়মকানুন। সুন্দরবনের আশপাশে অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়াই গড়ে উঠেছে প্রায় ৩৫টি রিসোর্ট ও পর্যটনকেন্দ্র—এমন অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেরই পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেই বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় সরকার বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করলেও এসব রিসোর্ট নির্মাণ ও পরিচালনায় নিয়ম মানা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দা, পরিবেশকর্মী ও পর্যটনসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, পর্যটন ব্যবসার আড়ালে অনেক জায়গায় জলাশয় ভরাট, গাছপালা নিধন, অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম হচ্ছে।
অনুমোদন ছাড়াই পর্যটন ব্যবসা
স্থানীয় সূত্রের দাবি, সুন্দরবনের কাছাকাছি বিভিন্ন এলাকায় পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে একের পর এক রিসোর্ট, কটেজ ও বিনোদনকেন্দ্র গড়ে উঠছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো কোনোটি দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা পরিচালনা করলেও প্রয়োজনীয় পরিবেশগত ছাড়পত্র, স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অনুমোদন কিংবা অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমতি নেওয়া হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, অনেক স্থাপনা নির্মাণের সময় পরিবেশগত প্রভাব, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি নিষ্কাশন ও আশপাশের জীববৈচিত্র্যের ওপর সম্ভাব্য ক্ষতির বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি।
সুন্দরবনের পরিবেশ নিয়ে শঙ্কা
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ অসংখ্য বন্যপ্রাণী, পাখি, মাছ ও জলজ প্রাণীর আবাসস্থল এই বন। ফলে সুন্দরবনের আশপাশে অপরিকল্পিত স্থাপনা ও পর্যটন অবকাঠামোর বিস্তার দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা পরিবেশবিদদের।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যটন অবশ্যই হতে পারে, তবে তা হতে হবে পরিবেশবান্ধব ও নিয়ন্ত্রিত। পর্যটকদের জন্য গড়ে ওঠা আবাসন ও বিনোদনকেন্দ্র থেকে উৎপন্ন প্লাস্টিক, পয়ঃবর্জ্য ও অন্যান্য বর্জ্য সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা না হলে তা নদী-খাল ও বনসংলগ্ন এলাকায় গিয়ে পড়তে পারে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনাতেও প্রশ্ন
স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু রিসোর্টে পর্যাপ্ত বর্জ্য সংরক্ষণ ও পরিশোধন ব্যবস্থা নেই। পর্যটকদের ব্যবহৃত প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন, খাবারের প্যাকেট ও অন্যান্য বর্জ্য কোথায় যাচ্ছে—তা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন।
পরিবেশকর্মীরা বলছেন, সুন্দরবনের পাশের এলাকায় একটি রিসোর্ট পরিচালনার আগে শুধু ভবন নির্মাণের অনুমতি থাকলেই হবে না; বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পয়ঃনিষ্কাশন, পানি ব্যবহার, শব্দদূষণ ও পরিবেশগত ঝুঁকির বিষয়গুলোও নিশ্চিত করতে হবে।
প্রশাসনের নজরদারি কতটা কার্যকর?
প্রশ্ন উঠেছে, অনুমোদন ও পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া যদি সত্যিই প্রায় ৩৫টি রিসোর্ট পরিচালিত হয়ে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি কোথায় ছিল?
পরিবেশ অধিদপ্তর, বন বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট পৌরসভা/স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত নজরদারি জোরদার করার দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে প্রতিটি রিসোর্টের বৈধ কাগজপত্র, জমির শ্রেণি, নির্মাণ অনুমোদন এবং পরিবেশগত ছাড়পত্র যাচাই করে দেখার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
তদন্তের দাবি
সুন্দরবনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দ্রুত একটি সমন্বিত তদন্তের দাবি উঠেছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে অনুমোদনহীন স্থাপনার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রয়োজনীয় বিধি অনুসরণের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন পরিবেশ সচেতন মহল।
তাদের মতে, সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে পর্যটন শিল্পের বিকাশ প্রয়োজন, কিন্তু সেই উন্নয়ন কোনোভাবেই সুন্দরবনের পরিবেশ ধ্বংসের কারণ হতে পারে না। রিসোর্ট নির্মাণ ও পরিচালনায় অনুমোদন, পরিবেশগত ছাড়পত্র এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নিয়ম কঠোরভাবে প্রয়োগ করা জরুরি।
তবে ৩৫টি রিসোর্টের সংখ্যা এবং অধিকাংশের পরিবেশগত ছাড়পত্র না থাকার অভিযোগ সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের নথি দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগের বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর, বন বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট রিসোর্ট মালিকদের বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনে তা সংযোজন করা উচিত।
মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন, ব্যুরো চীফ, খুলনা 


















