খুলনায় মার্কেন্টাইল ইসলামি লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির গ্রাহকদের মধ্যে মেয়াদপূর্তির অর্থ, সারেন্ডার ভ্যালু এবং মৃত্যুদাবির টাকা পেতে দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। একাধিক গ্রাহকের দাবি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হচ্ছে। একই সময়ে বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ (Insurance Development and Regulatory Authority)-এর অডিটে কোম্পানিসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ বিধি অনুসরণে অসঙ্গতির বিষয় উঠে আসায় গ্রাহকদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
খুলনা নগরীর শিববাড়ি মোড়ে অবস্থিত কোম্পানির সার্ভিস সেন্টারে প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকা থেকে গ্রাহকরা ক্লেইমের অগ্রগতি জানতে আসছেন বলে জানা গেছে। অনেকেই অভিযোগ করেন, অফিসে এসে বারবার একই ধরনের উত্তর পাচ্ছেন—হেড অফিস থেকে অর্থ ছাড় না হওয়ায় অর্থ প্রদান সম্ভব হচ্ছে না।
খুলনা সদর উপজেলার বাসিন্দা ও শিক্ষক মো. রফিকুল ইসলাম জানান, তিনি ২০২১ সালে একটি ১০ বছর মেয়াদি জীবনবীমা পলিসি গ্রহণ করেন। নির্ধারিত সময় শেষে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিলেও এখনো অর্থ হাতে পাননি। তাঁর ভাষ্য, “দীর্ঘ সময় ধরে অফিসে আসা-যাওয়া করছি। প্রতিবারই বলা হচ্ছে হেড অফিস থেকে টাকা আসেনি।”
একই ধরনের অভিযোগ করেন রূপসা উপজেলার বাসিন্দা সালমা বেগম। তাঁর দাবি, স্বামীর মৃত্যুর পর নিয়ম অনুযায়ী মৃত্যুদাবির আবেদন করলেও এখনো অর্থ পাননি। তিনি বলেন, “পরিবার চালাতে কষ্ট হচ্ছে। অফিসে গেলে বলা হয়, প্রক্রিয়া চলছে।”
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে কোম্পানির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দাবিগুলো পর্যায়ক্রমে নিষ্পত্তির চেষ্টা চলছে। খুলনা শাখার দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, হেড অফিস থেকে অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং অনেক দাবির নিষ্পত্তি দ্রুত সম্পন্ন করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
এদিকে আইডিআরএর অডিট প্রতিবেদনে কোম্পানিসহ কয়েকটি জীবনবীমা প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, প্রচলিত বিধিমালা অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ নিরাপদ সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ রাখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু কিছু প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সেই অনুপাত বজায় রাখা হয়নি বলে অডিটে পর্যবেক্ষণ উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপদ ও তারল্যসম্পন্ন বিনিয়োগের ঘাটতি থাকলে ক্লেইম নিষ্পত্তিতে বিলম্বের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বীমা খাত সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, জীবনবীমা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা নির্ভর করে সঠিক বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা, পর্যাপ্ত তারল্য এবং সময়মতো দায় পরিশোধের ওপর। যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে নগদ অর্থের প্রবাহে সংকট দেখা দেয়, তাহলে ক্লেইম, সারেন্ডার ও মেয়াদপূর্তির অর্থ পরিশোধে বিলম্ব হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। পাশাপাশি অতিরিক্ত প্রশাসনিক ব্যয়, কমিশন ব্যয় এবং দুর্বল আর্থিক পরিকল্পনাও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের এক অধ্যাপক বলেন, জীবনবীমা খাতে গ্রাহকের আস্থা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করা এবং ক্লেইম দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ানো জরুরি।
এ বিষয়ে গ্রাহকদের প্রত্যাশা, তাদের বৈধ দাবি দ্রুত নিষ্পত্তি করা হবে এবং ক্লেইম প্রক্রিয়ায় অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব দূর করতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে। অন্যদিকে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আইডিআরএর নিয়মিত তদারকি, অডিট পর্যবেক্ষণের বাস্তবায়ন এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে জীবনবীমা খাতে গ্রাহকের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন, ব্যুরো চীফ, খুলনা 






















