বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছেন বোর্ডের বর্তমান চেয়ারম্যান প্রফেসর খোন্দকার মোহাম্মদ সাদেকুর রহমান এবং রেজিস্ট্রার প্রফেসর এস এম তৌহিদুজ্জামান। দায়িত্বের ক্ষেত্র আলাদা হলেও বোর্ডের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, পরীক্ষাব্যবস্থাকে সুষ্ঠু করা এবং অতীতের অনিয়ম দূর করাই তাঁদের অভিন্ন লক্ষ্য। সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন নেতৃত্বের সমন্বিত উদ্যোগে বোর্ডের কার্যক্রমে ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর খোন্দকার মোহাম্মদ সাদেকুর রহমান গত ৭ জুন দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের এই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এর আগে কুমিল্লা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডসহ শিক্ষা প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কাজ করছেন।
নির্ভীক সংবাদকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে চেয়ারম্যান বলেন, “আমার মূল দায়িত্ব পরীক্ষা-সংক্রান্ত বিষয়গুলো দেখা। দাখিল, আলিম, ফাজিল ও কামিল পরীক্ষা যেন সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত হয়, সে জন্য আমরা কাজ করছি। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডকে ভালো করার জন্য আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।”
বোর্ডের অতীতের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এটা দুর্নীতির আখড়া ছিল, এটা সত্য। এখন আমরা চেষ্টা করছি এটাকে ভালো করার জন্য।”
তবে বোর্ডের প্রশাসনিক কার্যক্রম ও কমিটি-সংক্রান্ত বিষয়ে বিস্তারিত জানতে রেজিস্ট্রারের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন চেয়ারম্যান। তিনি জানান, বোর্ডের কার্যক্রমে দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। তাঁর দায়িত্বের মূল ক্ষেত্র পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা, আর রেজিস্ট্রার দেখছেন প্রশাসনিক বিষয়গুলো।
প্রশাসনিক অনিয়ম দূর করতে নতুন উদ্যোগ
অন্যদিকে, বোর্ডের রেজিস্ট্রার হিসেবে গত মে মাসে দায়িত্ব গ্রহণ করেন প্রফেসর এস এম তৌহিদুজ্জামান। বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের এই অভিজ্ঞ কর্মকর্তা এর আগে যশোর মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের কলেজ পরিদর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনা ও কমিটি-সংক্রান্ত কার্যক্রমে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছেন।
রেজিস্ট্রারের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে মাদ্রাসার গভর্নিং বডি অনুমোদন, কমিটি গঠন, শিক্ষক নিয়োগ-সংক্রান্ত প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর শৃঙ্খলা-সংশ্লিষ্ট বিষয় তদারকি।
নির্ভীক সংবাদকে রেজিস্ট্রার বলেন, “আমরাও চেষ্টা করছি সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে। চেয়ারম্যান স্যার পরীক্ষার দিকটি দেখেন, আর আমি দেখি প্রশাসনিক দিক। অতীতে কমিটি নিয়ে অনেক অনিয়ম হয়েছে। সেই জঞ্জাল সরাতেই আমরা নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করেছি।”
গভর্নিং বডির সভাপতি হতে স্নাতক ডিগ্রি বাধ্যতামূলক
বোর্ডের প্রশাসনিক কার্যক্রমে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে গত ২০ মে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। প্রজ্ঞাপনে মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সভাপতি হওয়ার ক্ষেত্রে স্নাতক ডিগ্রিকে যোগ্যতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ উদ্যোগের মাধ্যমে কমিটি গঠনপ্রক্রিয়ায় নির্ধারিত যোগ্যতা ও বিধিবিধান অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তবে নতুন এই নির্দেশনার বাস্তব প্রয়োগ, কমিটি গঠনে স্বচ্ছতা এবং নিয়োগ-সংক্রান্ত কার্যক্রমে জবাবদিহি নিশ্চিত করা কতটা সম্ভব হচ্ছে, তা নির্ভর করবে ধারাবাহিক তদারকি ও কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর।
দালালচক্রের দৌরাত্ম্য কমার দাবি
বকশীবাজারে অবস্থিত বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের কার্যালয়ে দালালদের দৌরাত্ম্য আগের তুলনায় কমেছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। তাঁদের মতে, প্রশাসনিক কার্যক্রমে নিয়মকানুন অনুসরণ এবং দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের তদারকি জোরদার হলে সেবাপ্রত্যাশীদের ভোগান্তি আরও কমানো সম্ভব।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, চেয়ারম্যান ও রেজিস্ট্রারের সমন্বিত উদ্যোগ কেবল ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং পরীক্ষাব্যবস্থা, কমিটি গঠন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং সেবাপ্রদানের প্রতিটি পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির বাস্তব প্রতিফলন ঘটবে।
বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অতীতের অনিয়মের অভিযোগ দূর করে একটি জবাবদিহিমূলক, সুশৃঙ্খল ও জনবান্ধব প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দুই শীর্ষ কর্মকর্তার উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয়, তা সময়ের সঙ্গে স্পষ্ট হবে।
আনিসুর রহমান মোল্লা 























