ঢাকা ০৪:৩৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
খুলনায় পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় ট্রাক চালক ও দুই মোটরসাইকেল আরোহীসহ নিহত ৩ আহত ২০ বাসযাত্রী বাংলাদেশ প্রবাসী কল্যাণ পরিষদ সিলেট বিভাগীয় কমিটির সভা অনুষ্ঠিত ফাইল জিম্মি করে অবৈধ লেনদেন: রাজউকের দুই কর্মচারীর ৫০ কোটি টাকার সাম্রাজ্য অতিরিক্ত ডিআইজি আবদুল্লাহ আল জহির ক্লোজড খুলনায় বিএনপির দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে আহত ৭ সাভারে ওএমএস কালোবাজারির তথ্য সংগ্রহে ৪ সাংবাদিককে হেনস্তা ও জেলে প্রেরণ: এসআই আব্বাসের কৌশল, ওসি সাইফুল আলমের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন কালোবাজারি সেলিমকে বাঁচাতে ওসি মাহবুবের তালবাহানা! সাংবাদিকদের ওপর হামলার হুমকি ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের নতুন নেতৃত্বে নানা সমীকরণ, আলোচনায় শীর্ষ পদের সম্ভাব্য প্রার্থীরা ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচনে দুই প্রার্থীসহ চারজনকে শোকজ ঠাকুরগাঁও টাংগন নদী হতে প্রভাবশালীদের নেতৃত্বে অবৈধ বালু উত্তোলন: নীরব দর্শকের ভূমিকায় প্রশাসন

ফাইল জিম্মি করে অবৈধ লেনদেন: রাজউকের দুই কর্মচারীর ৫০ কোটি টাকার সাম্রাজ্য

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্রশাসনিক কার্যক্রমে চরম অনিয়ম, ফাইল আটকে রেখে প্রকাশ্য ঘুষ গ্রহণ এবং ব্যাপক দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। ভুক্তভোগী ঠিকাদার মেহেদী হাসানের লিখিত অভিযোগ ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের অনুসন্ধান সূত্রে জানা যায়, সাধারণ কর্মচারী হয়েও প্রতিষ্ঠানটিতে একচ্ছত্র আধিপত্য ও সমান্তরাল দুর্নীতির সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন দুই অফিস সহকারী।

অভিযুক্তরা হলেন—রাজউকের জোন-৫ ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর প্রকল্প দপ্তরের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর ফাতেমা বেগম মলি এবং এস্টেট ও ভূমি-২ শাখার অফিস সহকারী জাহিদুল ইসলাম সবুজ।

২৫-৩২ হাজার টাকার বেতনে ৫০ কোটির সম্পদ

অভিযোগ অনুযায়ী, সরকারি ১০ম থেকে ১৩শ গ্রেডের কর্মচারী হিসেবে মাসে মাত্র ২৫ থেকে ৩২ হাজার টাকা মূল স্কেলে বেতন পান তারা। অথচ ক্ষমতার অপব্যবহার ও ঘুষের টাকায় তারা গড়ে তুলেছেন আনুমানিক ৫০ কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ। অনুসন্ধানে তাদের নামে ধানমন্ডি, ঝিগাতলা ও পূর্বাচলে একাধিক বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও মূল্যবান প্লট ছাড়াও গাজীপুরের রিসোর্টে বড় অঙ্কের বেনামি বিনিয়োগের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব অনিয়ম নিয়ে ২০২০ সালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং ২০২২ ও ২০২৩ সালে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একাধিক লিখিত অভিযোগ দায়ের হলেও দৃশ্যমান কোনো প্রতিকার মেলেনি।

৪২১ নম্বর কক্ষে ‘ঘুষের হাট’ ও কাজের বিনিময়ে কমিশন

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথি আটকে রেখে সরাসরি ঘুষ আদায় এবং ঠিকাদারি বিল ছাড়করণে মোটা অঙ্কের কমিশন দাবি করাই এই চক্রের নিয়মিত কাজ। ইতিপূর্বে গণমাধ্যমে “অদৃশ্য পুতুলনাচে বন্দি রাজউক: মলি-সবুজের দুর্নীতির সমান্তরাল সাম্রাজ্য” এবং ৪২১ নম্বর কক্ষকে কেন্দ্র করে “ঘুষের হাট” শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এছাড়া পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) লঙ্ঘন করে স্বার্থের চরম সংঘাত (Conflict of Interest) ঘটিয়ে নিজ স্বামীর ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানকে অবৈধভাবে কাজ পাইয়ে দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে ফাতেমা বেগম মলির বিরুদ্ধে।

মামলা সত্ত্বেও স্বপদে বহাল: আইনি লঙ্ঘন

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব কর্মকাণ্ড দেশের প্রচলিত আইনে স্পষ্টত দণ্ডনীয়:

* জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ: বেতনের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিপুল সম্পদ অর্জন দুদক আইন, ২০০৪-এর ২৬ ও ২৭ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

* ঘুষ ও মানি লন্ডারিং: ফাইল জিম্মি করে ঘুষ আদায় দণ্ডবিধির ১৬১ ধারা এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ অনুযায়ী বিচার্য।

* বিধিমালার ব্যত্যয়: ‘সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮’-এর ৩৯(২) ধারা অনুযায়ী ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করার বিধান রয়েছে। অথচ ২০২৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি শাহআলী থানায় দায়েরকৃত মামলায় (সিআর নং ৯৯/২০২৫) অভিযুক্ত হওয়া সত্ত্বেও তারা বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।

এর আগে দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ও দ্য ডেইলি স্টার-এ রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ১৭৭ কোটি টাকার দুর্নীতির মামলা এবং সংস্থার সার্বিক অনিয়ম নিয়ে আদালতের কঠোর পর্যবেক্ষণের খবর প্রকাশিত হয়েছিল। পর্যবেক্ষকদের মতে, উচ্চপর্যায়ের অনিয়মের পাশাপাশি নিচের স্তরের কর্মচারীদের এমন বেপরোয়া সিন্ডিকেট রাজউকের প্রাতিষ্ঠানিক সুনাম পুরোপুরি ধসিয়ে দিচ্ছে।

প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে অভিযুক্ত কর্মচারীদের সম্পদের নিরপেক্ষ ফরেনসিক অডিট, ৪২১ নম্বর কক্ষসহ সংশ্লিষ্ট শাখাগুলোতে ম্যানুয়াল পদ্ধতির বদলে ডিজিটাল ফাইল ট্র্যাকিং ও সার্বক্ষণিক সিসিটিভি নজরদারি নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে অভিযুক্তদের সাময়িক বরখাস্ত করে বিভাগীয় ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নিতে রাজউক চেয়ারম্যানের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগীরা।

Tag :
About Author Information

Nirvik Sangbad

জনপ্রিয় সংবাদ

খুলনায় পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় ট্রাক চালক ও দুই মোটরসাইকেল আরোহীসহ নিহত ৩ আহত ২০ বাসযাত্রী

ফাইল জিম্মি করে অবৈধ লেনদেন: রাজউকের দুই কর্মচারীর ৫০ কোটি টাকার সাম্রাজ্য

আপলোড সময় ০২:০৮:১২ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্রশাসনিক কার্যক্রমে চরম অনিয়ম, ফাইল আটকে রেখে প্রকাশ্য ঘুষ গ্রহণ এবং ব্যাপক দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। ভুক্তভোগী ঠিকাদার মেহেদী হাসানের লিখিত অভিযোগ ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের অনুসন্ধান সূত্রে জানা যায়, সাধারণ কর্মচারী হয়েও প্রতিষ্ঠানটিতে একচ্ছত্র আধিপত্য ও সমান্তরাল দুর্নীতির সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন দুই অফিস সহকারী।

অভিযুক্তরা হলেন—রাজউকের জোন-৫ ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর প্রকল্প দপ্তরের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর ফাতেমা বেগম মলি এবং এস্টেট ও ভূমি-২ শাখার অফিস সহকারী জাহিদুল ইসলাম সবুজ।

২৫-৩২ হাজার টাকার বেতনে ৫০ কোটির সম্পদ

অভিযোগ অনুযায়ী, সরকারি ১০ম থেকে ১৩শ গ্রেডের কর্মচারী হিসেবে মাসে মাত্র ২৫ থেকে ৩২ হাজার টাকা মূল স্কেলে বেতন পান তারা। অথচ ক্ষমতার অপব্যবহার ও ঘুষের টাকায় তারা গড়ে তুলেছেন আনুমানিক ৫০ কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ। অনুসন্ধানে তাদের নামে ধানমন্ডি, ঝিগাতলা ও পূর্বাচলে একাধিক বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও মূল্যবান প্লট ছাড়াও গাজীপুরের রিসোর্টে বড় অঙ্কের বেনামি বিনিয়োগের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব অনিয়ম নিয়ে ২০২০ সালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং ২০২২ ও ২০২৩ সালে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একাধিক লিখিত অভিযোগ দায়ের হলেও দৃশ্যমান কোনো প্রতিকার মেলেনি।

৪২১ নম্বর কক্ষে ‘ঘুষের হাট’ ও কাজের বিনিময়ে কমিশন

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথি আটকে রেখে সরাসরি ঘুষ আদায় এবং ঠিকাদারি বিল ছাড়করণে মোটা অঙ্কের কমিশন দাবি করাই এই চক্রের নিয়মিত কাজ। ইতিপূর্বে গণমাধ্যমে “অদৃশ্য পুতুলনাচে বন্দি রাজউক: মলি-সবুজের দুর্নীতির সমান্তরাল সাম্রাজ্য” এবং ৪২১ নম্বর কক্ষকে কেন্দ্র করে “ঘুষের হাট” শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এছাড়া পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) লঙ্ঘন করে স্বার্থের চরম সংঘাত (Conflict of Interest) ঘটিয়ে নিজ স্বামীর ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানকে অবৈধভাবে কাজ পাইয়ে দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে ফাতেমা বেগম মলির বিরুদ্ধে।

মামলা সত্ত্বেও স্বপদে বহাল: আইনি লঙ্ঘন

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব কর্মকাণ্ড দেশের প্রচলিত আইনে স্পষ্টত দণ্ডনীয়:

* জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ: বেতনের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিপুল সম্পদ অর্জন দুদক আইন, ২০০৪-এর ২৬ ও ২৭ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

* ঘুষ ও মানি লন্ডারিং: ফাইল জিম্মি করে ঘুষ আদায় দণ্ডবিধির ১৬১ ধারা এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ অনুযায়ী বিচার্য।

* বিধিমালার ব্যত্যয়: ‘সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮’-এর ৩৯(২) ধারা অনুযায়ী ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করার বিধান রয়েছে। অথচ ২০২৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি শাহআলী থানায় দায়েরকৃত মামলায় (সিআর নং ৯৯/২০২৫) অভিযুক্ত হওয়া সত্ত্বেও তারা বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।

এর আগে দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ও দ্য ডেইলি স্টার-এ রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ১৭৭ কোটি টাকার দুর্নীতির মামলা এবং সংস্থার সার্বিক অনিয়ম নিয়ে আদালতের কঠোর পর্যবেক্ষণের খবর প্রকাশিত হয়েছিল। পর্যবেক্ষকদের মতে, উচ্চপর্যায়ের অনিয়মের পাশাপাশি নিচের স্তরের কর্মচারীদের এমন বেপরোয়া সিন্ডিকেট রাজউকের প্রাতিষ্ঠানিক সুনাম পুরোপুরি ধসিয়ে দিচ্ছে।

প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে অভিযুক্ত কর্মচারীদের সম্পদের নিরপেক্ষ ফরেনসিক অডিট, ৪২১ নম্বর কক্ষসহ সংশ্লিষ্ট শাখাগুলোতে ম্যানুয়াল পদ্ধতির বদলে ডিজিটাল ফাইল ট্র্যাকিং ও সার্বক্ষণিক সিসিটিভি নজরদারি নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে অভিযুক্তদের সাময়িক বরখাস্ত করে বিভাগীয় ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নিতে রাজউক চেয়ারম্যানের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগীরা।