কিস্তিতে কেনা মোটরসাইকেল বকেয়া কিস্তির কারণে জব্দ করে নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার পরও গ্রাহকের কাছে কিস্তি ও লাভের অর্থ দাবি করার অভিযোগ উঠেছে নীলয় মোটরস লিমিটেডের খুলনা শোরুমের বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, জব্দ করা মোটরসাইকেল ফেরত নিতে এককালীন বড় অঙ্কের টাকা পরিশোধের জন্য চাপ দেওয়ার অভিযোগও করেছেন ভুক্তভোগী গ্রাহক মোঃ শাহীন হোসেন।
এ ঘটনায় প্রতিকার চেয়ে নীলয় মোটরস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং খুলনার শোরুম ম্যানেজার আবু হুরায়রা খানের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন তিনি। আবেদনে মোটরসাইকেল ফেরত দেওয়া, জব্দকালীন সময়ের কিস্তি পুনর্বিবেচনা এবং তার আর্থিক সক্ষমতা অনুযায়ী বকেয়া কিস্তি পরিশোধের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
ভুক্তভোগীর অভিযোগ, বিষয়টির সন্তোষজনক সমাধান না হলে তিনি জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে অভিযোগ করবেন এবং প্রয়োজন হলে আইনগত প্রতিকারের জন্য আদালতের দ্বারস্থ হবেন।
কিস্তিতে মোটরসাইকেল, আর্থিক সংকটে অনিয়মিত পরিশোধ
লিখিত অভিযোগে মোঃ শাহীন হোসেন জানান, তিনি নীলয় মোটরসের মাধ্যমে কিস্তিতে একটি Hero ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল ক্রয় করেন। সংশ্লিষ্ট ফাইল নম্বর 310525407। মোটরসাইকেলটির ইঞ্জিন নম্বর JA07AJR9A00560 এবং চেসিস নম্বর PSIJAW281RJC00488।
তিনি বলেন, আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে নির্ধারিত সময়ে সব কিস্তি পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি। তবে তিনি একেবারে অর্থ পরিশোধ বন্ধ করে দেননি; বরং সামর্থ্য অনুযায়ী বিভিন্ন সময়ে কম-বেশি করে কিস্তির টাকা পরিশোধ করেছেন। তার দাবি, এ পর্যন্ত পরিশোধ করা অর্থের বিবরণ কোম্পানির দেওয়া স্টেটমেন্টেই রয়েছে।
নোটিশের আগেই গাড়ি জব্দের অভিযোগ
শাহীন হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, নীলয় মোটরসের পক্ষ থেকে ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে ‘আর্থিক ছাড়করণ গাড়ি হস্তান্তর প্রসঙ্গে নোটিশ’ দেওয়া হয়। তবে তার আগেই, অর্থাৎ ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে খুলনা শোরুমের ম্যানেজার তার মোটরসাইকেলটি জব্দ করে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে যান।
তার অভিযোগ, গাড়ি জব্দের সময় তাকে কোনো ধরনের জব্দ রশিদ, প্রাপ্তি স্বীকারপত্র বা লিখিত গ্রহণপত্র দেওয়া হয়নি।
এ কারণে মোটরসাইকেলটি কখন, কী প্রক্রিয়ায় এবং কী শর্তে কোম্পানির হেফাজতে নেওয়া হয়েছে—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
জব্দের পরও সাত মাসের কিস্তি দাবি?
ভুক্তভোগীর সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো, মোটরসাইকেলটি ১৭ ফেব্রুয়ারি জব্দ করে নেওয়ার পরও তার কাছে পরবর্তী সময়ের কিস্তির অর্থ দাবি করা হচ্ছে।
লিখিত অভিযোগে তিনি দাবি করেছেন, শোরুম ম্যানেজারের পক্ষ থেকে বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করে বর্তমানে প্রায় সাত মাসের কিস্তি বাবদ ৭৬ হাজার টাকা লাভসহ দাবি করা হচ্ছে। এমনকি মোটরসাইকেলটি এককালীনভাবে নিতে হলে তাকে ইতোমধ্যে ১ লাখ ১৪ হাজার টাকার বেশি পরিশোধ করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ভুক্তভোগীর প্রশ্ন—মোটরসাইকেলটি যদি ইতোমধ্যে কোম্পানির হেফাজতে থাকে এবং ওই সময় তিনি মোটরসাইকেলটি ব্যবহারই করতে না পারেন, তাহলে সেই সময়ের কিস্তি, লাভ বা অন্যান্য চার্জ কীভাবে নির্ধারণ করা হচ্ছে?
‘কিস্তিতে কিনেছি, এককালীন টাকা দেব কীভাবে?’
শাহীন হোসেন তার আবেদনে বলেন, তিনি কিস্তিতে মোটরসাইকেল কিনেছেন কিস্তিতে টাকা পরিশোধ করার জন্যই। তার বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতিতে এককালীনভাবে বড় অঙ্কের টাকা পরিশোধ করা তার পক্ষে সম্ভব নয়।
তিনি জানান, তার নির্ধারিত মাসিক কিস্তি ৭ হাজার ৫০ টাকা। আর্থিক সংকট বিবেচনায় তিনি প্রতি মাসে ৩ হাজার ৫০০ টাকা করে বকেয়া পরিশোধ করতে প্রস্তুত।
এ বিষয়ে কোম্পানির কাছে তিনি মানবিক ও বাস্তবসম্মতভাবে কিস্তি পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন।
দুই দফা বিকল্প প্রস্তাব
লিখিত আবেদনে গ্রাহক দুটি বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছেন।
প্রথম বিকল্প:
জব্দ করা মোটরসাইকেলটি অবিলম্বে তাকে ফেরত দিতে হবে। একই সঙ্গে কোম্পানির হেফাজতে থাকা সময়ের কিস্তি পুনর্বিবেচনা করে তাকে প্রতি মাসে ৩ হাজার ৫০০ টাকা হারে বকেয়া পরিশোধের সুযোগ দিতে হবে।
দ্বিতীয় বিকল্প:
মোটরসাইকেল ফেরত দেওয়া সম্ভব না হলে সেটি আইনানুগ প্রক্রিয়ায় বিক্রি বা নিষ্পত্তি করে গ্রাহকের এ পর্যন্ত দেওয়া ৪৫ হাজার টাকা ডাউন পেমেন্ট এবং পরিশোধিত অন্যান্য কিস্তির অর্থ সমন্বয় করে তাকে চূড়ান্ত হিসাব দিতে হবে।
‘আইনগত প্রতিকার নেব’
আবেদনে শাহীন হোসেন কিস্তি ক্রয় ও সম্পদ জব্দের বিষয়ে প্রচলিত আইন এবং Hire Purchase and Installment Act, 1970-এর আলোকে বিষয়টি বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন।
তবে কোনো নির্দিষ্ট অর্থ দাবি বা কিস্তি আদায় আইনবিরোধী কি না, সেটি নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট চুক্তিপত্র, কিস্তির শর্ত, বকেয়া হিসাব, জব্দের প্রক্রিয়া এবং প্রযোজ্য আইন পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
গ্রাহকের দাবি, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখ থেকে মোটরসাইকেলটি কোম্পানির হেফাজতে থাকায় ওই সময় তিনি মোটরসাইকেলটি ব্যবহার করে কোনো সুবিধা ভোগ করেননি। তাই ওই সময়ের অর্থনৈতিক দায় কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, তার লিখিত ব্যাখ্যা ও পূর্ণাঙ্গ হিসাব চান তিনি।
সাত কর্মদিবসের সময়সীমা
নীলয় মোটরস কর্তৃপক্ষকে লিখিত আবেদনে শাহীন হোসেন ৭ কর্মদিবসের মধ্যে লিখিত জবাব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সন্তোষজনক সমাধান না হলে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে অভিযোগ করবেন। পাশাপাশি প্রয়োজন হলে আইনগত প্রতিকার চেয়ে আদালতেরও আশ্রয় নেবেন।
জবাবদিহির প্রশ্ন
একজন গ্রাহকের মোটরসাইকেল বকেয়া কিস্তির কারণে জব্দ করার ক্ষেত্রে যথাযথ নথি ও রশিদ দেওয়া হয়েছে কি না, জব্দের পর কিস্তি ও লাভের হিসাব কীভাবে করা হয়েছে, গ্রাহককে পূর্ণাঙ্গ স্টেটমেন্ট দেওয়া হয়েছে কি না এবং সম্পদ জব্দ ও পরবর্তী নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে চুক্তি ও প্রচলিত আইন যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে কিস্তিতে পণ্য বা যানবাহন বিক্রির ক্ষেত্রে গ্রাহকের আর্থিক সংকটকে বিবেচনায় নিয়ে পুনঃতফসিল, কিস্তি পুনর্গঠন বা পারস্পরিক সমঝোতার সুযোগ রয়েছে কি না, সেটিও সংশ্লিষ্ট চুক্তি ও আইন অনুযায়ী পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
ভুক্তভোগীর দাবি, তিনি কোম্পানির পাওনা পরিশোধ থেকে বিরত থাকতে চান না; বরং তার সামর্থ্য অনুযায়ী নিয়মিতভাবে বকেয়া পরিশোধ করতে চান। এজন্য তিনি কোম্পানির কাছে কিস্তি পুনর্গঠনের সুযোগ চেয়েছে।
খুলনা অফিস 






















